প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ না নিয়ে জ্বালানি খাতকে দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা। তাদের দাবি, দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় একদিকে বৈদেশিক নির্ভরতা বেড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহন করতে হচ্ছে।
ফুলবাড়ী দিবস উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা দেশের জ্বালানি নীতি, গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা উত্তোলন এবং বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং আমদানিনির্ভর নীতির কারণে এই খাতের সংকট আরও গভীর হয়েছে।
বক্তাদের অভিযোগ, দেশে নতুন নতুন এলাকায় তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের নীতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও সরাসরি চাপ পড়ে।
জ্বালানি খাতের সঙ্গে দেশের শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে গ্যাস ও জ্বালানির সংকট দেখা দিলে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, সম্ভাব্য জ্বালানি সম্পদের সঠিক অনুসন্ধান, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এবং পরিবেশ ও জনস্বার্থ বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
ফুলবাড়ী ইস্যু নিয়েও সমাবেশে বক্তারা তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। তাদের দাবি, ২০০৬ সালের ফুলবাড়ী আন্দোলনের পর যে ছয় দফা চুক্তির কথা বলা হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তারা অভিযোগ করেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার শর্ত থাকার পরও আবারও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বক্তাদের মতে, কয়লা বা অন্য কোনো খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক লাভের বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না। স্থানীয় মানুষের বসবাস, কৃষিজমি, পরিবেশ, পানি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে যদি সাধারণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় বা পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
সমাবেশে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, দেশের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো নিয়ে জনগণের সামনে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ তথ্য থাকা প্রয়োজন।
তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এমন কোনো চুক্তি করা উচিত নয়, যার ফলে বাংলাদেশকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দামে নির্দিষ্ট কোনো দেশ থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য হতে হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ নীতি অনুসরণ করা জরুরি।
তবে বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, জ্বালানি সরবরাহ এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের বিষয়গুলো বহুমাত্রিক এবং এসব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত নানা বিবেচনা কাজ করে।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে হবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে। নতুন শিল্পাঞ্চল, নগরায়ণ এবং বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন উৎসের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়।
দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি—সবকিছুর সমন্বয়ে একটি টেকসই জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব দেশের ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ দেশের জনগণের সম্পদ। তাই এসব সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনআস্থা আরও বাড়বে।
নারায়ণগঞ্জের এই সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। তারা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের জনবান্ধব এবং স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান। একই সঙ্গে ফুলবাড়ী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টিও সামনে আনেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের জেলা শাখার আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি। সদস্যসচিব ধীমান সাহা জুয়েল অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং দেশের জ্বালানি নীতি নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত। শিল্পকারখানা সচল রাখা, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য পরিবর্তিত হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো দ্রুত চাপের মুখে পড়ে। তাই দেশীয় সম্পদের সম্ভাবনা যাচাই এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
সমাবেশে বক্তাদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, দেশের জ্বালানি নীতিতে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা মনে করেন, জনগণের অর্থ ব্যয় করে পরিচালিত জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে জ্বালানি খাতের সংকট সমাধানে শ্রমিক, স্থানীয় জনগণ, পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারকদের মতামত সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।
ফুলবাড়ী দিবসের সমাবেশ থেকে বক্তারা তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট দাবি নয়, দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সমস্যার এমন সমাধান করতে হবে, যাতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয় এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ না পড়ে।
দেশের নিজস্ব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি কার্যকর জ্বালানি নীতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের সমাবেশে ওঠা এই দাবিগুলো আগামী দিনে দেশের জ্বালানি নীতি নিয়ে চলমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।