সর্বশেষ :
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ‘বিরোধী দল দমনের চক্রান্ত’: এনসিপি টিকিট কালোবাজারির প্রতিবাদে যাত্রীকে মারধরের অভিযোগ দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহার না হলে আইনি ব্যবস্থা: আসিফ মাহমুদ বর্ষার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ লাকসাম পৌরসভায় নির্বাচনি হাওয়া, সরগরম সম্ভাব্য প্রার্থীরা আসিফের দুর্নীতি এনসিপিতে ‘ওপেন সিক্রেট’: রাশেদ খান বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ নড়াইলে শিক্ষার্থীর মৃত্যু, মারধরের অভিযোগে তিন শিক্ষক আটক বাস ভাঙচুরের প্রতিবাদে জামালপুর-ঢাকা রুটে চলাচল বন্ধ বন্যার আঘাতে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ

বন্যার আঘাতে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
বন্যার আঘাতে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপালে আকস্মিক বন্যায় দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ভয়াবহ বন্যার আঘাতে দেশটির বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে চলমান বিদ্যুৎ সরবরাহ আপাতত পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গত ২৬ আগস্ট নেপালে আকস্মিক বন্যার পর দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে নদী ও পাহাড়ি অঞ্চলের আশপাশে অবস্থিত অবকাঠামো বন্যার তীব্রতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার প্রভাব পড়েছে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর ওপরও, যেগুলো নেপালের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

নেপাল বর্ষা মৌসুমে সাধারণত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধাজনক সময় পার করে। পাহাড়ি নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় দেশটির জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি করার সুযোগ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশটি এখন শুধু নিজস্ব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই কাজ করছে না, বরং ভারত ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশেও বিদ্যুৎ রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশও সম্প্রতি ভারতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থা ব্যবহার করে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করেছিল। এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু বন্যায় সংশ্লিষ্ট দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই সরবরাহ বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন পাওয়া দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলমি হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ত্রিশূলি হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প। বন্যার কারণে কেন্দ্র দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত সপ্তাহ থেকে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

দুটি কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশে নেপালি বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়েছে। এই বিদ্যুৎ ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশে পৌঁছাত। ফলে একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে, এই ঘটনা তার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

নেপালের ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার পর বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এতে দেশটির সামগ্রিক বিদ্যুৎ রপ্তানিও কমে গেছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে নেপাল শুষ্ক মৌসুমে গড়ে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে সক্ষম হলেও বন্যার পর সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নেপালের বিদ্যুৎ খাতের জন্য এ পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ জলবিদ্যুৎ দেশটির অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎস। নদীর পানির প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় একদিকে বর্ষাকালে উৎপাদন বাড়ে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগ অবকাঠামোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি কেন্দ্রই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে বিকল্প কোনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।

বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে বাংলাদেশে নেপালি বিদ্যুৎ রপ্তানি আবার শুরু হতে পারে। তবে এর জন্য উৎপাদন সক্ষমতা, সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট তিন দেশের অনুমোদন ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে বিদ্যুৎ সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। একটি দেশের উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্য দেশে পৌঁছাতে তৃতীয় দেশের সঞ্চালন ব্যবস্থা ব্যবহারের এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুতের উৎস বহুমুখীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস তৈরি করে। বিশেষ করে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে কোনো একটি নির্দিষ্ট জ্বালানি বা উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল, বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতার পাশাপাশি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামোগত ক্ষতি বা উৎপাদন সমস্যার কারণে একটি উৎস বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে নেপাল থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় সীমিত হলেও এই সংযোগের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। এটি ভবিষ্যতে নেপালের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথ আরও বিস্তৃত করতে পারে।

নেপালের জন্যও বিদ্যুৎ রপ্তানি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই রপ্তানি আয় এবং আঞ্চলিক সরবরাহ উভয়ই বাধাগ্রস্ত হয়।

বন্যার মানবিক ক্ষয়ক্ষতিও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানি এবং বহু মানুষের নিখোঁজ থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধার, আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করতে হলে প্রথমে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় মেরামত, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সঞ্চালন অবকাঠামো সচল করার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে বন্যার পর পুনর্বাসন ও মেরামত কার্যক্রম অনেক সময় জটিল হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে নেপালি বিদ্যুৎ সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মেরামতের পর পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে কত সময় লাগবে, সেটিও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ বাজারে নেপালের জলবিদ্যুৎ ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দেশটির পাহাড়ি নদীগুলোতে বিপুল জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ, ভারতসহ বৃহত্তর অঞ্চলে বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাহাড়ি নদীতে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং অতিবৃষ্টির মতো ঘটনা ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিকল্পনায় আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি সাময়িক বিদ্যুৎ বিঘ্নের বিষয় নয়। এটি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা, আন্তঃদেশীয় সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ঝুঁকির বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

এখন সংশ্লিষ্ট তিন দেশের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা যায় কি না এবং ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কত দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারে, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে নেপালের বন্যাকবলিত এলাকায় মানবিক সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত