নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চায় পিছিয়ে পড়েছে সমাজ: জামায়াত আমির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চায় পিছিয়ে পড়েছে সমাজ: জামায়াত আমির

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশে পিছিয়ে পড়ার সুযোগে অপসংস্কৃতি সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছে। তাঁর ভাষ্য, এই পরিস্থিতিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ বা ‘কালচারাল অ্যাগ্রেশন’ হিসেবে দেখা যায়। তিনি মনে করেন, শুধু বক্তব্য বা প্রতিবাদ দিয়ে এ প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়; সুস্থ ও নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে ‘দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ’ আয়োজিত নাতে রাসূল (সা.) প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক চর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সুস্থ চিন্তার বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব একটি সক্রিয় সংস্কৃতি থাকে। সেই সংস্কৃতির মধ্যে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও জীবনধারার প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু নিজেদের সংস্কৃতিকে লালন ও ধারণ করার ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাইরের নানা সাংস্কৃতিক প্রভাবের পাশাপাশি এমন কিছু প্রবণতা জায়গা করে নিয়েছে, যেগুলোকে তিনি অপসংস্কৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশে সমাজ পিছিয়ে পড়লে অন্য সংস্কৃতির প্রভাব সহজেই বিস্তার লাভ করে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা সামাজিক আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষা ও তরুণদের চিন্তাভাবনার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সমাজে সাংস্কৃতিক অধঃপতনের প্রভাব বোঝাতে তিনি একটি সাম্প্রতিক ধরনের সামাজিক ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, যাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা, তাঁকে কীভাবে সম্মান করা হচ্ছে? কলেজের অধ্যক্ষকে টেনে-হিঁচড়ে পুকুরে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা কোনো সুস্থ সামাজিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের আচরণ সমাজে সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ ও নৈতিকতার সংকটকে সামনে আনে।

শফিকুর রহমান বলেন, একটি প্রজন্মকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের মূল্যবোধ, আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতা শেখানোর ক্ষেত্রেও পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করে। তাই একটি সমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ জরুরি। তাঁর মতে, সুস্থ সংস্কৃতির পরিসর তৈরি হলে সেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটতে পারে।

শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে আসে। তিনি বলেন, শুধু বক্তৃতা, প্রতিবাদ কিংবা সমালোচনার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য নিজেদের সাংস্কৃতিক শক্তিকে সক্রিয় করতে হবে। সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বাড়ানো এবং দেশীয় ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ, লেখক ও সম্পাদক আবুল আসাদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নাতে রাসূল (সা.) প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

এদিকে একই দিনে সিরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘রোড টু সিরাহ-২৬’ জাতীয় সীরাত পাঠ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পরীক্ষা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৩ হাজার ৪৫৬ জন শিক্ষার্থী তিনটি গ্রুপে নিবন্ধন করেছিলেন।

প্রতিযোগিতাটির উদ্দেশ্য ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অধ্যয়ন, সুন্নাহভিত্তিক জীবন গঠন এবং তরুণদের মধ্যে সীরাতচর্চা বিস্তৃত করা। প্রথম ধাপের অনলাইন এমসিকিউ পরীক্ষার পর তিনটি গ্রুপ থেকে মোট ৬৩৫ জন শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। চূড়ান্ত পর্বের ফলাফল ঘোষণা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেওয়া হয়।

‘রোড টু সিরাহ-২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শফিকুর রহমান। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগাহ। অনুষ্ঠানে ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ আল্লামা কামাল উদ্দিন আব্দুল্লাহ জাফরী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা জয়নুল আবেদিন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল আলমসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতায় ‘ক’ গ্রুপে ৩ হাজার ৫৮২ জন, ‘খ’ গ্রুপে ৩ হাজার ১৯৭ জন এবং ‘গ’ গ্রুপে ৫ হাজার ২৪৩ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেন। অনলাইন পরীক্ষার পর ‘ক’ গ্রুপ থেকে ২২১ জন, ‘খ’ গ্রুপ থেকে ২০৮ জন এবং ‘গ’ গ্রুপ থেকে ২০৬ জন চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেন।

এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার পাশাপাশি সীরাত অধ্যয়নের প্রতি আগ্রহ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, বই, ক্রেস্ট ও সনদের ব্যবস্থাও রাখা হয়। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী কয়েকজনকে ওমরাহ পালনের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণাও আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার এবং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রবাহের কারণে তরুণদের সামনে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মূল্যবোধ ধরে রাখার প্রশ্নও সামনে এসেছে। এই বাস্তবতায় শফিকুর রহমানের বক্তব্যে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

একটি সমাজের সংস্কৃতি কেবল গান, সাহিত্য, নাটক কিংবা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের পারস্পরিক আচরণ, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান, শিক্ষকের মর্যাদা, পরিবারে দায়িত্ববোধ, সামাজিক সহনশীলতা এবং অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক চর্চার অংশ। ফলে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজ নির্মাণের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।

শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সেই বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার কথাই উঠে এসেছে। তাঁর আহ্বান অনুযায়ী, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুধু অপসংস্কৃতির সমালোচনা নয়, বরং বিকল্প হিসেবে জ্ঞান, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করা প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করলে নতুন প্রজন্মের সামনে একটি সুস্থ ও ইতিবাচক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত