চিংড়ি রপ্তানির ভ্যালু চেইনে যুক্ত হচ্ছেন চাষিরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
চিংড়ি রপ্তানির ভ্যালু চেইনে যুক্ত হচ্ছেন চাষিরা

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বামী হারানোর পর দুই মেয়েকে নিয়ে নতুন করে জীবনযুদ্ধ শুরু করেছিলেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার পার মাগুরখালি গ্রামের রত্না মণ্ডল। ২০১৩ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব পুরোপুরি এসে পড়ে তার কাঁধে। চিংড়ির ঘেরই হয়ে ওঠে তার প্রধান আয়ের উৎস। নিজের হাতে চাষ করা মাছ স্থানীয় ডিপোতে বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন তিনি। বড় মেয়ে পায়েলের পড়াশোনা শেষ করে বিয়ের আয়োজন করেছেন, আর ছোট মেয়ে দীপু মণ্ডল এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। দীর্ঘদিনের এই সংগ্রামের মধ্যে এবার চিংড়ি চাষে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন রত্নার মতো স্থানীয় কৃষকেরা।

ডুমুরিয়ার পার মাগুরখালি গ্রামের রত্না মণ্ডলের মতো প্রায় ৫০ জন চিংড়িচাষি সম্প্রতি একটি সংগঠিত উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। প্রায় দেড় বছর ধরে উৎপাদক পর্যায়ের চাষিদের একত্রিত করার উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড। লক্ষ্য শুধু চিংড়ি উৎপাদন নয়, বরং উৎপাদনের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত একটি স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এই উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সি-ফুড পর্যবেক্ষণ সংস্থা মনটেরি বে অ্যাকুয়ারিয়াম, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন। সম্মিলিত এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো চিংড়িচাষিদের আধুনিক ও দায়িত্বশীল চাষাবাদে দক্ষ করে তোলা এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।

পার মাগুরখালি গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই দীর্ঘদিন ধরে চিংড়ি চাষের সঙ্গে জড়িত। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভাংগাড়িয়া নদীর নোনা পানি চিংড়ি চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় বছরের বড় একটি সময় ঘেরগুলোতে চিংড়ি উৎপাদন করা হয়। নদীর ওপারে রয়েছে পাইকগাছা উপজেলা। বর্ষাকালে পানির ধরন পরিবর্তিত হলে স্থানীয় অনেক কৃষক চিংড়ির পাশাপাশি ধান চাষেও ফিরে যান। ফলে এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রকৃতির পানি, মাটি ও জলবায়ুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চিংড়ি চাষ করলেও আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অনেক কৃষকের পরিচয় সীমিত। অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করাই ছিল তাদের প্রধান পদ্ধতি। নিরাপদ ও মানসম্মত পোনা নির্বাচন, ঘেরে খাদ্যের সঠিক ব্যবহার, রোগ শনাক্তকরণ, পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ, ওষুধ ও রাসায়নিক ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ কিংবা মাছের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছিল নানা ঘাটতি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা—ন্যায্য দাম না পাওয়া। কৃষকদের অভিযোগ, ঘেরে উৎপাদিত চিংড়ি একাধিক হাত ঘুরে প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছায়। স্থানীয় ডিপো, ফড়িয়া ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগীর স্তর পেরিয়ে রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছাতে গিয়ে উৎপাদনমূল্যের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের বড় পার্থক্য তৈরি হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির চাহিদা থাকলেও উৎপাদনকারী কৃষকের আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ে না।

মাগুরখালি গ্রামের চিংড়িচাষিদের টিম লিডার সুমন গোলদারও দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে ঘেরে বিভিন্ন ধরনের সার ও ওষুধ ব্যবহার করা হতো। বাজার থেকে কেনা খাবার দিয়ে মাছ বড় করা হতো এবং উৎপাদিত চিংড়ি স্থানীয় ডিপোতে বিক্রি করা হতো। এরপর সেই মাছ কয়েক ধাপ পেরিয়ে কোম্পানির কাছে যেত। ফলে চাষির শ্রম ও ঝুঁকির তুলনায় লাভের অংশ সীমিত থাকত।

প্রায় দেড় বছর আগে টোটালফুডের কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ সময়ের মধ্যে কয়েক দফা প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা চিংড়ি চাষের বিভিন্ন দিক নিয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আধুনিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পদ্ধতিতে চিংড়ি উৎপাদনের বিষয়ে তাদের ধারণা দেওয়া হচ্ছে।

প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো উৎপাদন ব্যবস্থায় তথ্য সংরক্ষণের সংস্কৃতি চালু করা। মৃন্ময় মণ্ডল, সনৎ সিংহ মণ্ডল, দীপঙ্কর মণ্ডল, চিন্ময় মণ্ডলসহ চাষিরা এখন ঘেরে রেকর্ড বই ব্যবহার করছেন। এতে পোনা মজুত, খাদ্য প্রয়োগ, খাদ্যের উপকরণ, মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, রাসায়নিক সার ও ওষুধের ব্যবহার, প্রোবায়োটিক প্রয়োগ, পানির গুণগত মান পরীক্ষা এবং মাছ ধরার তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়মিত লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।

কোনো ঘেরে মাছের আচরণ বা স্বাস্থ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চাষিরা এখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। এর ফলে সমস্যাকে শুরুতেই শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, মাছের স্বাস্থ্য, খাদ্যের নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত বিষয়গুলোকেও একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ও মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. অলকেশ কুমার ঘোষ মনে করেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া সত্ত্বেও চিংড়ি খাতের মূল উৎপাদক কৃষকের দিকে দীর্ঘদিন যথেষ্ট মনোযোগ ছিল না। তার মতে, রপ্তানি শিল্পের মূল কাঁচামাল যে কৃষকের ঘের থেকে আসে, সেই কৃষককে সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রে আনাই এই উদ্যোগের বড় পরিবর্তন।

কৃষকদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও সরাসরি তাদের কাছ থেকে মাছ সংগ্রহের উদ্যোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে রোগাক্রান্ত মাছের নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে পরীক্ষা ও গবেষণার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সমস্যা বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করে কৃষকদের বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে। চিংড়ি আমদানিকারক দেশগুলো এখন শুধু পণ্যের আকার, স্বাদ কিংবা দাম বিবেচনা করে না; উৎপাদনের পদ্ধতি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব, শ্রম পরিস্থিতি এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশের চিংড়িকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে উৎপাদন পর্যায় থেকেই মান নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড উৎপাদকদের নিয়ে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ও সংগঠিত কৃষকভিত্তিক ভ্যালু চেইন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, মাগুরখালির মতো চারটি এলাকার প্রায় সাড়ে ৬০০ নিবন্ধিত চাষি এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কৃষক নিবন্ধন ও ম্যাপিংয়ের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণ, পানি ও মাটি পরীক্ষা এবং চিংড়ির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদনের শুরুতেই মান নিশ্চিত করার কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

খুলনার রূপসা উপজেলার জাবুসা এলাকায় ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড। পরের বছর প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনে যায়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাছ ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। চলতি বছরের জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এ মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানটি স্বর্ণপদক অর্জন করেছে। প্রায় ৪৪৫ টন হিমায়িত মাছ রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি ৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আয় করেছে বলে জানানো হয়েছে। তাদের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬০ টন এবং তিনটি হিমাগারে প্রায় ৩ হাজার টন মাছ সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মেহেদী হাসান মো. হেফজুর রহমান জানান, শুধু কাঁচা মাছ বা চিংড়ি রপ্তানি না করে মূল্য সংযোজন করে রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট খাদ্যপণ্য তৈরির ওপর তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে দেশের চিংড়ি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারের সরাসরি সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্য ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষককে সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্রে রেখে একটি কাঠামোবদ্ধ ভ্যালু চেইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন উৎপাদনের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকের সঙ্গে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পর্ক গড়ে উঠলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীলতাও কমতে পারে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এসকে কামরুল আলম কৃষকদের বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। তার মতে, হিমায়িত চিংড়ি খাতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে উৎপাদক কৃষককে শুধু কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে না দেখে পুরো বিপণন ও মূল্য সংযোজন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হলেও খাতটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উৎপাদনের মান, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং কৃষকের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করার ওপর। ডুমুরিয়ার পার মাগুরখালির মতো এলাকায় চাষিদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি বাজারসংযোগের যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তা সফল হলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের চিংড়ি রপ্তানিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

রত্না মণ্ডলের মতো কৃষকের কাছে এই পরিবর্তনের অর্থ শুধু উন্নত পদ্ধতিতে চিংড়ি উৎপাদন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের পড়াশোনা এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার প্রত্যাশা। মাঠের কৃষক যদি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ ও মানসম্মত চিংড়ি উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারেন, তাহলে দেশের রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজারো চিংড়িচাষি পরিবারের জীবনেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত