প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬’। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) নভোথিয়েটারে আয়োজিত এই মেলায় যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতকে আরও গতিশীল করার পাশাপাশি উদ্ভাবকদের সঙ্গে নীতিনির্ধারক, শিল্প খাত, বিনিয়োগকারী ও বাজারব্যবস্থার সংযোগ তৈরির লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের ইনোভেশন ফেয়ারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতারা তাদের নতুন নতুন ধারণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ তুলে ধরছেন। মেলায় শতাধিক উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা অংশ নিয়েছেন। তারা এক হাজারের বেশি উদ্ভাবন প্রদর্শন করছেন। ফলে তরুণ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিপ্রেমী এবং নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য এটি দেশের অন্যতম বড় উদ্ভাবনী আয়োজন হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি-১ জাহিদুল ইসলাম রনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শনিবার রাজধানীর নভোথিয়েটারে শুরু হওয়া ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬’-এ যোগ দিয়েছেন। এ সময় মেলার বিভিন্ন আয়োজন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রতি সরকারের আগ্রহের বিষয়টি সামনে এসেছে।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল সেবা, কৃষিপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে ব্যবসা ও জনজীবনে পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশেও তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে নিজেদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় উদ্ভাবকদের কাজকে নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬’-এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই সংযোগকে আরও কার্যকর করা। উদ্ভাবন শুধু প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যাতে তা শিল্প খাতে ব্যবহার, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই মেলায় বিভিন্ন পক্ষকে এক জায়গায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একটি নতুন উদ্ভাবন বাস্তবে মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, কিন্তু সেটিকে বাজারজাত করার জন্য প্রয়োজন অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা, নীতিগত সহযোগিতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা। অনেক তরুণ উদ্ভাবকের কাছে নতুন ধারণা থাকলেও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বা বাজারসংযোগের অভাবে তাদের উদ্যোগ বড় পরিসরে পৌঁছাতে পারে না। এ ধরনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরিতে ইনোভেশন ফেয়ারের মতো আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মেলায় শতাধিক উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতার অংশগ্রহণের বিষয়টিও এ খাতের প্রতি আগ্রহের ব্যাপকতা তুলে ধরে। এক হাজারের বেশি উদ্ভাবন প্রদর্শনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের প্রযুক্তি, পণ্য ও ধারণা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
উদ্ভাবন খাতের বিকাশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো উদ্ভাবনী ধারণা যখন বাস্তব পণ্য বা সেবায় রূপ নেয়, তখন তার উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং সম্প্রসারণের জন্য শিল্প খাতের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। একইভাবে নতুন উদ্যোগকে টেকসই করতে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। মেলায় নীতি সহায়তা, শিল্প খাত, বিনিয়োগ এবং বাজারের সুযোগের সঙ্গে উদ্ভাবনের সংযোগ ঘটানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা এই প্রয়োজনের সঙ্গেই সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে। চাকরির প্রচলিত ধারণার বাইরে নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গড়ে তোলার দিকে অনেকেই এগিয়ে আসছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার ছোট উদ্যোগকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগকে টেকসই করতে দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়ন, গবেষণা, নীতি সহায়তা ও বাজারসংযোগ অপরিহার্য।
ইনোভেশন ফেয়ারের মতো আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উদ্ভাবনকে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। অনেক সময় নতুন প্রযুক্তি বা উদ্ভাবনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি পরিচিতি তৈরি হয় না। প্রদর্শনীর মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক তুলে ধরলে সম্ভাব্য ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা এসব উদ্যোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পান। এতে উদ্ভাবক ও ব্যবহারকারীর মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হতে পারে।
তিন দিনব্যাপী এবারের আয়োজনকে ঘিরে তাই শুধু প্রযুক্তি প্রদর্শনের বিষয়টি নয়, বরং দেশের উদ্ভাবনী পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। একটি উদ্ভাবনী অর্থনীতি গড়ে তুলতে গবেষণা ও সৃজনশীলতার পাশাপাশি উদ্ভাবকদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সেই পরিবেশে সরকারি নীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প খাতের সহযোগিতা এবং উদ্যোক্তাদের নিজস্ব সক্ষমতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।
প্রধানমন্ত্রীর এই মেলায় অংশগ্রহণকে তাই দেশের উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ খাতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার একটি দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। উদ্ভাবক ও তরুণ উদ্যোক্তারা যাতে তাদের ধারণা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বৃহত্তর বাজারে যেতে পারেন, সে জন্য নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হলে এই খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ভূমিকা ক্রমেই বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সে কারণে উদ্ভাবকদের শুধু স্বীকৃতি নয়, তাদের উদ্যোগকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
আগারগাঁওয়ের নভোথিয়েটারে শুরু হওয়া ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬’ সেই বৃহত্তর সম্ভাবনারই একটি মঞ্চ। এক হাজারের বেশি উদ্ভাবন নিয়ে শতাধিক উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতার অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মেলা আগামী দিনের প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে নতুন ধারণা, বিনিয়োগ ও সহযোগিতার পথ তৈরি করবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।