নাব্যতা ফিরলেও ফেরি নেই চিলমারী-রৌমারী রুটে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
নাব্যতা ফিরলেও ফেরি নেই চিলমারী-রৌমারী রুটে

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রামের চিলমারী-রৌমারী নৌপথে দীর্ঘদিনের নাব্যতা সংকট কাটাতে ড্রেজিং শেষ হয়েছে। নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংকটাপন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় পানির গভীরতাও ফিরেছে। ফেরি চলাচলের জন্য নৌপথ এখন প্রস্তুত বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু নৌপথ প্রস্তুত থাকলেও নেই ফেরি। ফলে নাব্যতা ফিরলেও কুড়িগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুটে এখনও স্বাভাবিক হয়নি যানবাহন ও পণ্য পারাপার।

ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় চিলমারী ও রৌমারীসহ আশপাশের এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী যানবাহনের চালক, ব্যবসায়ী এবং নিয়মিত নদীপথ ব্যবহারকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের পড়তে হচ্ছে বাড়তি সময় ও ব্যয়ের চাপে। অনেকে যানবাহন নিয়ে ঘাটে এসে ফেরির দেখা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়ছে জ্বালানি খরচ, সময় এবং পরিবহন ব্যয়।

জানা গেছে, গত ১৪ আগস্ট নাব্যতা সংকটের কারণে চিলমারী-রৌমারী নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর নৌপথ সচল করতে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে সর্বশেষ চলাচলকারী ফেরি ‘কদম’ গত ২ সেপ্টেম্বর মেরামতের জন্য নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ডে পাঠানো হয়। ফলে বর্তমানে পুরো নৌপথটি ফেরিশূন্য হয়ে পড়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, নাব্যতা সংকট নিরসনে গত ২৫ জুলাই থেকে চিলমারী-রৌমারী নৌপথে ড্রেজিং শুরু হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএসের কারিগরি পরামর্শ অনুযায়ী চিলমারী ও রৌমারী ঘাট এবং খেরুয়ার চরসংলগ্ন সংকটাপন্ন এলাকায় খননকাজ পরিচালনা করা হয়। এ কাজে চারটি কাটার সাকশন ড্রেজার ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীতে পলি জমে নৌযান চলাচলে যে বাধা তৈরি হয়েছিল, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে তা অনেকটাই দূর করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ফেরি চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পানির গভীরতা রয়েছে। নৌপথে ফেরি চলাচলের উপযোগী পরিস্থিতি বজায় রাখতে সংরক্ষণমূলক ড্রেজিংও চালানো হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো নদীর তলদেশে আবার দ্রুত পলি জমে নৌপথের গভীরতা কমে যাওয়া ঠেকানো।

বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের চিলমারী নদীবন্দরের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথের সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় গভীরতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তার মতে, বর্তমানে ফেরি চলাচলের ক্ষেত্রে নাব্যতাজনিত কোনো বাধা নেই।

তবে নৌপথ প্রস্তুত হওয়ার পরও ফেরি না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কবে থেকে আবার এই রুটে যানবাহন পারাপার শুরু হবে। সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে ফেরি চলাচল দ্রুত চালুর বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু করার জন্য বিআইডব্লিউটিএর পুরকৌশল শাখা বা ড্রেজিং বিভাগও উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সমীর চন্দ্র পালের স্বাক্ষরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চিলমারী নদীবন্দরের সহব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) ও এরিয়া ইনচার্জের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে ড্রেজিংয়ের পর নৌপথের চ্যানেল সচল রাখা এবং নিয়মিত ফেরি চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, ড্রেজিং করে নৌপথ চালু রাখার পাশাপাশি নিয়মিত ফেরি চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। নদীতে পলি জমার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই ফের নাব্যতা সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণে ড্রেজিংয়ের সুফল ধরে রাখতে নিয়মিত নৌযান চলাচল এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিলমারী নদীবন্দরে ফেরি সার্ভিস চালুর ইতিহাসও খুব দীর্ঘ নয়। নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘কুঞ্জলতা’ ফেরির মাধ্যমে চিলমারী নদীবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। পরে একই বছরের ৪ অক্টোবর ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ এবং নভেম্বরে ‘কদম’ ফেরি যুক্ত হয়। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নৌপথে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিল।

কিন্তু সেই প্রত্যাশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সময়ের ব্যবধানে একে একে ফেরিগুলো প্রত্যাহার করা হয়। তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনটি ফেরি সরিয়ে নেওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ আবারও ফেরিশূন্য হয়ে পড়েছে। নাব্যতা সংকটের কারণে এক দফা বন্ধ হওয়ার পর ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথের গভীরতা ফিরলেও ফেরি সংকট নতুন করে সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের জন্য এই ফেরি রুটের গুরুত্ব শুধু নদী পারাপারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন যাতায়াতে এই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফেরি বন্ধ থাকলে নদী পার হতে বিকল্প পথ বেছে নিতে হয়। এতে একদিকে যেমন যাত্রার দূরত্ব বাড়ে, অন্যদিকে সময় ও অর্থ দুটিই বেশি ব্যয় হয়।

পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচলের কারণে জ্বালানি খরচ বাড়ে এবং পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদরেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি করছে।

বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী নদীবন্দরের ম্যানেজার (বাণিজ্য) আতিক সোহেল আকাশ জানিয়েছেন, ড্রেজিং বিভাগের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মেরিন অফিসার ও পাইলট বিভাগ পানির গভীরতা পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। ফেরি পাঠানোর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তবে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এসএম আশিকুজ্জামানের বক্তব্যে ফেরি চালুর সময় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, নাব্যতা পরিস্থিতির বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জেনেছে। তবে ফেরি পাঠানোর বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। চিলমারীর দুটি ফেরির ডকিং শেষ হওয়ার পর সেখানে ফেরি পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ফলে নৌপথের একটি বড় সমস্যা আপাতত সমাধান হলেও ফেরি সংকটের কারণে পুরোপুরি সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় মানুষ। নদীতে প্রয়োজনীয় গভীরতা ফিরেছে, ড্রেজিং কার্যক্রমও চলছে, কিন্তু পারাপারের জন্য ফেরি না থাকায় সেই প্রস্তুতি এখনো কার্যকর পরিবহনসেবায় রূপ নেয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নাব্যতা ফিরে আসার পর আর দেরি না করে চিলমারী-রৌমারী রুটে ফেরি চলাচল পুনরায় চালু করা হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ড্রেজিং ও নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নাব্যতা সংকট যাতে বারবার ফেরি চলাচল বন্ধের কারণ না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে শুধু দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে না, কুড়িগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও গতি ফিরতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত