প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি গুদাম ও ফ্লোটিং মজুদ মিলিয়ে দেশে খাদ্যশস্যের মোট মজুদ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টনে। এর মধ্যে চাল, গম ও ধানের পাশাপাশি ফ্লোটিং মজুদও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ২২ লাখ ১০ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন। সাত মাসের ব্যবধানে সেই মজুদ বেড়ে হয়েছে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এ সময়ে সরকারি খাদ্যভান্ডারে যোগ হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য।
বর্তমান মজুদের বড় অংশই চাল। সরকারি মজুদে চাল রয়েছে ২০ লাখ ৩৬ হাজার ১০২ মেট্রিক টন। পাশাপাশি গম রয়েছে দুই লাখ ৩২ হাজার ১৮৩ টন এবং ধান রয়েছে ৩৪ হাজার ৭০ টন। এর বাইরে ফ্লোটিং মজুদের মধ্যে রয়েছে ৬৮ হাজার ৭২৩ টন গম। সব মিলিয়ে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ এখন ২৩ লাখ টনের বেশি।
খাদ্যশস্যের এই মজুদ বৃদ্ধি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারে অস্থিরতা, উৎপাদনে ঘাটতি কিংবা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি খাদ্যভান্ডারে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে সাধারণ মানুষের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের সক্ষমতা বাড়ে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখাও সহজ হয়।
তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরেও সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের ৪ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তির সময় দেশে চাল ও গম মিলিয়ে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ২১ লাখ ৩১ হাজার টন। তখন চালের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টন এবং গম ছিল এক লাখ ৭৭ হাজার টন। এক বছরের ব্যবধানে চাল ও গমের মজুদ মিলিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে দুই লাখ ২৮ হাজার ১৫৪ টন।
আরও দীর্ঘ সময়ের হিসাবেও খাদ্যশস্যের মজুদ বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩০ টন। বর্তমান মজুদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রায় দুই বছরের ব্যবধানে সরকারি খাদ্যভান্ডারে খাদ্যশস্যের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ছয় লাখ ৭৫ হাজার টন। এই বৃদ্ধিকে সরকারি খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু খাদ্যশস্য সংগ্রহ নয়, তা সংরক্ষণের অবকাঠামোও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। সরকারি খাদ্যগুদামগুলোর ধারণক্ষমতা আগে ছিল প্রায় ২৪ লাখ টন। বর্তমানে সেই সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রায় ২৭ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের মোট সক্ষমতা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরকারি খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির পরিধি বাড়ার কারণে নিরাপদ খাদ্য মজুদের মানদণ্ডও পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্যকে নিরাপদ মজুদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্যোগের ঝুঁকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে খাদ্যশস্যের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ মজুদের পরিমাণ ১৬ লাখ টনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারি খাদ্যভান্ডার শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বোরো সংগ্রহ কার্যক্রমে গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধান ও চাল মিলিয়ে ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৫ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন। সিদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে ১২ লাখ এক হাজার ৫৬৮ টন এবং আতপ চাল এক লাখ পাঁচ হাজার ৩১৩ টন। এর বাইরে ৫২৩ টন গমও সংগ্রহ করা হয়েছে।
বোরো মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে ধান ও চাল সংগ্রহের মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারি খাদ্যভান্ডার সমৃদ্ধ হয়, অন্যদিকে কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের একটি নিশ্চিত বাজার পান। সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষকের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং খাদ্যশস্যের সরকারি মজুদও শক্তিশালী হয়। এ কারণে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ কার্যক্রম খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি কৃষি অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
সরকারি মজুদ বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যশস্য আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মোট আট লাখ ২৭ হাজার ৭০০ টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে আমদানি হয়েছে ৬৫ হাজার ৮৬০ টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে সাত লাখ ৬১ হাজার ৮৪০ টন।
খাদ্যশস্যের উৎপাদন, সংগ্রহ, আমদানি ও সংরক্ষণ—এই চারটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার মাধ্যমে দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদন ভালো হলে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ বাড়ানো যায়। আবার কোনো মৌসুমে উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে বাজারে জরুরি পরিস্থিতিতে খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ শাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান সফল ও সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাঁর মতে, সরকারি খাদ্যগুদামে বর্তমানে চাল ও গমের পর্যাপ্ত ও নিরাপদ মজুদ রয়েছে। এই মজুদ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতীয় চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যশস্যের মজুদ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমন উৎপাদন ও সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জনেও সরকার আশাবাদী। আমন মৌসুমে উৎপাদন ও সংগ্রহ কার্যক্রম সন্তোষজনক হলে সরকারি খাদ্যভান্ডার আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেনও দেশের বর্তমান খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সন্তোষজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি খাদ্য মজুদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে খাদ্যশস্য পৌঁছে দেওয়া হয়। এসব কর্মসূচি নিয়মিত চালু রাখতে সরকারি গুদাম থেকে খাদ্যশস্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হয়। ফলে শুধু গুদামে খাদ্যশস্য জমা রাখাই নয়, প্রয়োজনের সময় তা সঠিকভাবে বিতরণ করার সক্ষমতাও খাদ্যনিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খাদ্যশস্যের মজুদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার মানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করতে হলে গুদামের পরিবেশ, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যের মান বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টিও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যার চাহিদা, কৃষিজমির পরিবর্তন, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। এমন বাস্তবতায় সরকারি খাদ্যভান্ডারে পর্যাপ্ত মজুদ রাখা রাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত প্রস্তুতি।
বর্তমান মজুদের পরিমাণ নিরাপদ মজুদের নতুন নির্ধারিত সীমা ১৬ লাখ টনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে খাদ্যনিরাপত্তা একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া হওয়ায় শুধু বর্তমান মজুদ দিয়ে ভবিষ্যতের সব ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায় না। উৎপাদন, সংগ্রহ, আমদানি, সংরক্ষণ এবং বিতরণ ব্যবস্থাকে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করা হলে জরুরি পরিস্থিতিতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি নিরাপদ মজুদের মানদণ্ড ১৬ লাখ টনে উন্নীত করার সিদ্ধান্তও ভবিষ্যৎ চাহিদা ও ঝুঁকিকে বিবেচনায় নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের বর্তমান মজুদ বৃদ্ধিকে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই মজুদ যেন প্রয়োজনের সময় দ্রুত ও সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদন থেকে গুদাম, গুদাম থেকে বাজার এবং সেখান থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে খাদ্য পৌঁছানোর পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখাই হবে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল চ্যালেঞ্জ।