কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধে প্রাণ গেল আনোয়ারের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ বার
কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধে প্রাণ গেল আনোয়ারের

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় কবরস্থানের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলায় আনোয়ার ভুঁইয়া (৪২) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার ভূমখাড়া ইউনিয়নের মানাখান গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে আহত আনোয়ারকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং অভিযুক্ত পক্ষের একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে মানাখান গ্রামের রহিম ঢালীর বাড়ির সামনে কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আনোয়ার ভুঁইয়া ও জাহিদুল ঢালির মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আনোয়ার ও লিটন নামে আরেক ব্যক্তির মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দুজনই গুরুতর আহত হন।

নিহত আনোয়ার ভুঁইয়া ভূমখাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সেকেন্দার ভুঁইয়ার ছেলে। স্থানীয়দের কাছে তিনি ওই এলাকার পরিচিত বাসিন্দা ছিলেন। হঠাৎ করে একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে তার মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি এলাকায়ও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মানাখান জামে মসজিদের কবরস্থানের জমি নিয়ে আনোয়ার ভুঁইয়া ও ইতালিপ্রবাসী জাহিদুল ঢালির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। জমিটির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে বিরোধের জেরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এ নিয়ে একটি মামলাও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়া চললেও বিরোধের পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যেই নতুন করে কথা-কাটাকাটি থেকে হামলার ঘটনা ঘটে।

বুধবার বিকেলের ঘটনার পর স্থানীয়রা আহত আনোয়ার ও লিটনকে দ্রুত উদ্ধার করে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা শুরু করেন। তবে আনোয়ারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। স্বজন ও স্থানীয়রা তাকে দ্রুত ঢাকার দিকে নিয়ে রওনা হন। কিন্তু পথেই তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়।

আহত লিটন বর্তমানে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। হামলার ঘটনায় আরও কেউ আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়েও বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা ও জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের চেষ্টা করছে।

আনোয়ারের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উত্তেজিত এলাকাবাসী জাহিদুল ঢালির বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বাড়ির কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তার বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায়নি।

এ ধরনের ঘটনায় একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, নড়িয়ার ঘটনাটি তারই একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কবরস্থানের মতো ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধ চলতে থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিরোধের শান্তিপূর্ণ ও আইনগত নিষ্পত্তির পরিবর্তে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে তা ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে বৃহত্তর সামাজিক সংঘাতেও রূপ নিতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি হামলায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মিরাজ জানিয়েছেন, কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে লাঠির আঘাতে একজন নিহত হয়েছেন। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলা হয়নি; আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলায় কারা জড়িত ছিলেন এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কারা অংশ নিয়েছেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় যাতে নতুন করে কোনো সংঘাত বা প্রতিশোধমূলক ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।

ঘটনার পর স্থানীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—দীর্ঘদিন ধরে চলা জমি-সংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই রাখা যায়। একটি বিরোধ আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও গুজব, উত্তেজনা ও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

নড়িয়ার মানাখান গ্রামের এই ঘটনা এখন তদন্তের বিষয়। আনোয়ার ভুঁইয়ার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

একটি কবরস্থানের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ায় এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে যাতে কোনো সহিংসতা না ঘটে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত