কানাডাকে ঘিরে ইইউকে ট্রাম্পের বাণিজ্য হুমকি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৪ বার
কানাডাকে ঘিরে ইইউকে ট্রাম্পের বাণিজ্য হুমকি

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ করার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রস্তাব দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, এই উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বৈরী পদক্ষেপ হিসেবে মনে হলে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তিনি।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইইউর প্রস্তাবকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, কানাডাকে ইইউর অ্যাসোসিয়েট সদস্য করার উদ্যোগ যদি বৈরী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে ইউরোপের ওপর ‘অত্যন্ত কঠোর’ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য বন্ধ করার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে ইইউর উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর এক দিন আগে ফন ডার লিয়েন কানাডাকে ইইউর প্রথম অ্যাসোসিয়েট সদস্য করার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন।

ফন ডার লিয়েনের প্রস্তাবটি ইইউ-কানাডা সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্কটিক অঞ্চলের সহযোগিতার দিকে নেওয়ার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তিনি কানাডার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত একটি ‘ভবিষ্যতের জোট’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কানাডার ইতোমধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। তবে ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ হওয়ার প্রস্তাবটি সেই বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের তুলনায় অনেক বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মধ্যেও এই নতুন ধরনের সদস্যপদের বাস্তব কাঠামো, অধিকার ও দায়িত্ব কী হবে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। ইইউতে কানাডার মতো একটি দেশের অ্যাসোসিয়েট সদস্য হওয়ার কোনো পূর্ববর্তী নজির নেই

ফন ডার লিয়েন তাঁর বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন’ ভাষণে কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনে সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে সমন্বয় এবং আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ উদ্যোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তিনি জানান।

ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে পরে বলা হয়েছে, কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রস্তাবটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। বরং উভয় পক্ষের অভিন্ন সক্ষমতা ও স্বার্থকে শক্তিশালী করাই এর উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ব্রাসেলসের অবস্থান অনুযায়ী, কানাডার সঙ্গে নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে না।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ইউরোপ সফরও বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি ‘অনন্য জোট’ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে অটোয়া ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের সাম্প্রতিক উত্তেজনাও এই নতুন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে দেখার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার করা মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে কানাডা তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগকে সেই বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কানাডার অর্থনীতির জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির রপ্তানির বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে কোনো বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে কানাডার জন্য বিকল্প বাজার ও অংশীদার খুঁজে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপের সঙ্গে গভীরতর সম্পর্ক সেই বিকল্পগুলোর একটি হতে পারে। তবে ইইউর অ্যাসোসিয়েট সদস্য হওয়ার প্রস্তাব বাস্তবে কতটা এগোয় এবং এর অর্থনৈতিক সুবিধা কতটা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে ইউরোপের জন্যও কানাডার সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ইউরোপ তার অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে। কানাডার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থান এবং ন্যাটোর সদস্য হিসেবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ট্রাম্পের হুমকির কারণে এই উদ্যোগ এখন নতুন একটি বাণিজ্যিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর মধ্যে ইতোমধ্যে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে কানাডাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের জন্য মার্কিন বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের ওপরও অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে একটি শর্তও রয়েছে। তিনি বলেছেন, কানাডাকে ইইউর অ্যাসোসিয়েট সদস্য করার উদ্যোগকে তিনি বৈরী পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন কি না, তার ওপর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর নতুন কোনো নির্দিষ্ট শুল্কহার ঘোষণা করা হয়নি কিংবা ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য মূলত সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত অংশীদারিত্ব কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং পারস্পরিক শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি ব্রাসেলস-অটোয়া সম্পর্ক কোন পথে এগোয়, তা এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে কানাডাকে ইইউর প্রথম অ্যাসোসিয়েট সদস্য করার প্রস্তাব এখন শুধু কানাডা ও ইউরোপের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় হিসেবে থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের কৌশলগত সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার প্রশ্ন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে ইইউ ও কানাডার মধ্যে আলোচনা এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন এ উদ্যোগকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং বাস্তবে কোনো বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত