প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীসহ চার ব্যক্তিকে অপহরণের পর হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সাব্বির। বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি দাবি করেন, ২০১০ সালের মে মাসে র্যাবের তৎকালীন ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের প্রধান জিয়াউল আহসানের উপস্থিতি ও নির্দেশনায় র্যাব-৮-এর ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা ওই চারজনকে হত্যা করেন।
মেজর সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামও ছিলেন। তাদের পাথরঘাটার চরদুয়ানি এলাকার বলেশ্বর নদীতে একটি মাছ ধরার ট্রলারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের চোখ বেঁধে গুলি করার পর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান। তাঁর সাক্ষ্যে ঘটনাটির সঙ্গে জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে আসে।
তবে আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। মেজর সাব্বিরের বক্তব্যে যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে, সেগুলোর সত্যতা শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, জেরা এবং অন্যান্য উপাদান পর্যালোচনার মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল নির্ধারণ করবেন। ফলে সাক্ষীর বক্তব্যকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুমের মামলায় সাক্ষ্য দেন মেজর সাব্বির। তিনি জানান, ২০১০ সালের মে মাসে র্যাব-৮-এর ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা পাথরঘাটার চরদুয়ানি এলাকায় ওই চার ব্যক্তিকে নিয়ে যান। তাঁর দাবি, পুরো শরীর ও মুখ ঢেকে তাদের মাছ ধরার ট্রলারে তোলা হয়েছিল। এরপর বলেশ্বর নদীতে নিয়ে গিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়।
মেজর সাব্বিরের সাক্ষ্যে উঠে আসা ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নয়, বরং বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীদের পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল—সেই প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিহতদের একজন নজরুল ইসলাম ছিলেন, যিনি বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের এভাবে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ মামলাটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে মেজর সাব্বির আরও দাবি করেন, একই ধরনের পদ্ধতিতে ২০১০ সালে আরও একজনকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০১১ সালে আলকাস নামে এক নৌযানচালক, যিনি জিয়াউল আহসানের কথিত গুম অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে সাক্ষী দাবি করেন, তাকেও জোরপূর্বক গুম করে হত্যা করা হয় বলে তিনি জানান।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর একই মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ট্রলারচালক আব্বাস মল্লিক। তাঁর সাক্ষ্যেও নদীপথে বন্দিদের নিয়ে গিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠে আসে। আব্বাস মল্লিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা ব্যক্তিদের একটি ট্রলারে করে সুন্দরবনসংলগ্ন চরদুয়ানি এলাকায় নেওয়া হতো। সেখানে তাদের গুলি করার পর মরদেহে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আব্বাস মল্লিক আরও দাবি করেছিলেন, কিছু বন্দিকে একবার এবং কাউকে দুইবার গুলি করা হতো। পরে তাদের গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। তাঁর সাক্ষ্যে ট্রলারের ভেতরে রক্তের চিহ্ন পরিষ্কার করার কথাও উঠে আসে। এসব বক্তব্যও বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই সাক্ষীর বক্তব্যে নদীপথ ব্যবহার করে বন্দিদের সরিয়ে নেওয়া এবং হত্যার অভিযোগের একটি মিল পাওয়া যায়। তবে পৃথক সাক্ষ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য, পার্থক্য এবং প্রত্যক্ষ জ্ঞানের মাত্রা আদালতের বিচারিক মূল্যায়নের বিষয়। কোনো সাক্ষীর বক্তব্য একা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, সেটিও মামলার পরবর্তী পর্যায়ের ওপর নির্ভর করবে।
জিয়াউল আহসান বাংলাদেশের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং র্যাবের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন। মামলার শুনানিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। অন্যদিকে জিয়াউল আহসান অতীতে নিজেকে ‘মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার’ বলে দাবি করেছেন।
মামলার বর্তমান পর্যায়ে সাক্ষীদের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এসব সাক্ষ্যের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ঘটনাক্রম, সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের পরিচয়, ঘটনাস্থল এবং অভিযুক্তদের কথিত ভূমিকা সম্পর্কে আদালতের সামনে তথ্য উপস্থাপিত হচ্ছে। সাক্ষীদের বক্তব্যের পাশাপাশি নথি, অন্যান্য সাক্ষ্য এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যও মামলার বিচারিক মূল্যায়নের অংশ হবে।
জিয়াউল আহসানের আইনজীবীপক্ষও বিচারপ্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি তাঁর আইনজীবী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর কাছে তাঁকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় একক ভ্যানে না নিয়ে অন্যান্য বন্দির সঙ্গে পরিবহনের আবেদন করেছেন। সেখানে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়।
মামলার শুনানিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সামনে আসছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে পুরোনো অভিযোগগুলোও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগের পাশাপাশি আসামিপক্ষের বক্তব্য এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের সামগ্রিক মূল্যায়নই শেষ পর্যন্ত মামলার পরিণতি নির্ধারণ করবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণের পর তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য এবং এরপর যুক্তিতর্কের পর্যায় আসবে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মেজর সাব্বিরের বৃহস্পতিবারের সাক্ষ্য মামলার ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে সামনে এসেছে।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও মর্মান্তিক ঘটনা। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ পরবর্তীতে নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন কি না, তাঁদের সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত—এ ধরনের প্রশ্ন বহু বছর ধরেই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষীদের বক্তব্য সেই প্রশ্নগুলোর কিছু অংশ আদালতের নথিতে আনছে।
মেজর সাব্বিরের বৃহস্পতিবারের সাক্ষ্যে বলেশ্বর নদী, চরদুয়ানি এবং একটি মাছ ধরার ট্রলারকে ঘিরে যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, তা মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আরও যাচাই করা হবে। বিশেষ করে কার নির্দেশে কী ঘটেছিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার সঙ্গে অন্য প্রমাণের মিল কতটা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আইনগতভাবে কতটা প্রমাণিত হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে।
এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত সাক্ষ্যগুলো থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও হত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় একাধিক সাক্ষী তাঁদের প্রত্যক্ষ বা সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতার কথা আদালতের সামনে তুলে ধরছেন। মেজর সাব্বিরের সাক্ষ্য সেই ধারাবাহিকতায় নতুন তথ্য সামনে এনেছে। তবে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব বক্তব্যকে অভিযোগ ও সাক্ষ্য হিসেবেই দেখা হবে। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কোন অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং কোনটি প্রমাণিত হয়নি।