সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে আলেমদের উদ্বেগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ বার
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে আলেমদের উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত নতুন আইনের প্রয়োগ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন একদল তরুণ আলেম। বুধবার সকালে সচিবালয়ে আইনমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬’ নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন মতামত ও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে মুসলিম নাগরিকদের সম্পত্তি হস্তান্তর, হেবা, ওসিয়ত ও মিরাসের বিধানের সঙ্গে সংশোধিত আইনের প্রয়োগ কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।

বৈঠকের পর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তরুণ আলেমরা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের যে উদ্দেশ্য—বিশেষ করে পিতা-মাতা, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সুরক্ষা—তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁদের বক্তব্য, মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরের সঙ্গে ধর্মীয় বিধানের সম্পর্ক থাকায় নতুন আইনের কিছু দিক আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সম্পত্তি মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও পারিবারিক সম্পদ। একটি পরিবারে জমি, বাড়ি কিংবা অন্যান্য সম্পদ শুধু অর্থনৈতিক মূল্য বহন করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং উত্তরাধিকারীদের অধিকার। ফলে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর, দাতার ভোগাধিকার সংরক্ষণ এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার বণ্টনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নানা দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বৈঠকে তরুণ আলেমদের বক্তব্যেও এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁরা আইনমন্ত্রীকে জানান, মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে হেবা, ওসিয়ত ও মিরাসের বিধান কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক ধর্মীয় কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁদের মতে, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করে একই সঙ্গে সম্পত্তির ভোগাধিকার মৃত্যুর পর পর্যন্ত কার্যকর রাখার ব্যবস্থা প্রচলিত হেবার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পরীক্ষা করা দরকার।

তরুণ আলেমদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তির মালিক জীবদ্দশায় সেটি হস্তান্তর করলেও যদি প্রকৃত ভোগ বা ব্যবহার পরবর্তী সময়ে কার্যকর হয়, তাহলে সেটি হেবা নাকি ওসিয়তের বৈশিষ্ট্য বহন করছে—এ নিয়ে ধর্মীয় আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, কোনো পরিস্থিতিতে এই বিধানের প্রয়োগ যদি ওসিয়তের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, তাহলে মুসলিম উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত মিরাসের অধিকার নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বৈঠকে তাঁরা আরও একটি বিষয় সামনে আনেন—আইনের অপব্যবহারের সম্ভাবনা। তাঁদের বক্তব্য, নতুন বিধানের মাধ্যমে কোনো উত্তরাধিকারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতার স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের অধিকারও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিবেচ্য হতে পারে।

এ কারণে দেশের শীর্ষ মুফতি, ফকিহ, ইসলামি আইন গবেষক এবং আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তরুণ আলেমরা। তাঁদের মতে, এমন একটি কমিটির মাধ্যমে সংশোধিত আইনের বিধানগুলো ধর্মীয় আইন, প্রচলিত আইন এবং সাধারণ নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার—এই তিনটি দিক থেকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

তরুণ আলেমদের প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে উঠে এসেছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরির বিষয়টি। তাঁদের বক্তব্য, সম্পত্তির মালিক বা দাতার জীবদ্দশায় তাঁর নিরাপত্তা ও ভোগের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের অধিকার যাতে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে হেবা, ওসিয়ত ও মিরাসের ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে আইনের প্রয়োগের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে প্রবীণদের সুরক্ষার বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে। বাস্তব জীবনে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যেখানে বাবা-মা বা বয়স্ক কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় সন্তান বা অন্য কারও নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর ওই সম্পত্তির ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বা বসবাসের অধিকার নিয়ে সমস্যায় পড়েন। এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করার বিষয়টি আইনের আলোচনায় এসেছে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এর আগে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রবীণ বাবা-মায়ের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর প্রবীণ বাবা-মা অসহায় হয়ে পড়েন। তাঁদের সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের বিধান আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, কেউ নিজের ধর্মীয় বিধান অনুসরণ করতে চাইলে নতুন আইন তার পথে বাধা হওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়নি।

তবে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার একটি অংশ মুসলিম পারিবারিক আইন ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে ঘিরে। এর আগে বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন ও ব্যক্তিও সংশোধিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের কয়েকটি বিধান নিয়ে পর্যালোচনা ও সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে বিশেষভাবে হেবা ও মিরাসের বিধানের সঙ্গে নতুন আইনের সামঞ্জস্যের বিষয়টি উঠে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে তরুণ আলেমদের সঙ্গে আইনমন্ত্রীর বৈঠককে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময়ের একটি পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে উপস্থিত আলেমরা সরাসরি আইনটি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ তুলে ধরার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে আরও আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বৈঠকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ, জাতীয় উলামা মশায়েখ আইম্মাহ পরিষদের মহাসচিব মুফতি রেজাউল করিম আবরার, ইসলামবাগ মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি আব্দুল কাইয়ুম কাসেমী, বাংলাদেশ ফিকহ একাডেমির মহাপরিচালক মুফতি ফয়সাল মাহমুদ হাবিবী, জাতীয় উলামা মশায়েখ আইম্মাহ পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী এবং মোহাম্মদপুর মোহাম্মদী হোমস জামে মসজিদের খতিব মুফতি আদনান মাসউদসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে চলমান আলোচনায় এখন মূল বিষয় হয়ে উঠেছে, নতুন আইনের মাধ্যমে প্রবীণ ও দাতার সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় ও উত্তরাধিকার কাঠামোর অধিকার কীভাবে সমন্বিত করা যায়। একদিকে জীবিত ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের নিরাপত্তা এবং নিজের সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে উত্তরাধিকারীদের আইনগত ও ধর্মীয় অধিকারও সংশ্লিষ্ট পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে আরও বিশেষজ্ঞ মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে। তরুণ আলেমদের প্রস্তাবিত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন হলে সংশোধিত বিধানগুলোর ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনগত প্রভাব নিয়ে আরও কাঠামোবদ্ধ আলোচনা সম্ভব হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।

সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ বাংলাদেশের সমাজে নতুন কোনো বিষয় নয়। তাই আইনটির উদ্দেশ্য যেমন প্রবীণ ও দাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেমনি এর প্রয়োগ যেন নতুন কোনো উত্তরাধিকার বিরোধ বা আইনগত জটিলতার কারণ না হয়—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সচিবালয়ের বৈঠকে উঠে আসা মতামতগুলো সেই বৃহত্তর আলোচনারই অংশ, যেখানে ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকার, পারিবারিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় বিধান এবং রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত