ইসি নিয়ে গোলাম পরওয়ারের ৮ দফা দাবি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ বার
ইসি নিয়ে গোলাম পরওয়ারের ৮ দফা দাবি

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে কমিশনের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের জন্য একটি সুস্পষ্ট, চূড়ান্ত, সময়বদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণাসহ আট দফা দাবি জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে গত কয়েক দিনে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে তৈরি হওয়া মতপার্থক্য।

এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কয়েক ধাপে আয়োজনের একটি সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর এবং শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে আয়োজনের কথা বলা হয়েছিল। তবে পরদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ঘোষিত সময়সূচি সম্পর্কে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আগে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়ে থাকে।

এর পর নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ঘোষিত সময়সূচিটি একেবারেই প্রাথমিক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রস্তুতিমূলক বৈঠকের পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে কমিশন।

এই ঘটনাপ্রবাহের পরই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনি রূপরেখা প্রকাশের পর সরকারের আপত্তির কারণে সেটিকে আবার ‘প্রাথমিক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক সহযোগিতা থাকা স্বাভাবিক; তবে সহযোগিতার নামে কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর এই বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল নির্বাচন পরিচালনায় কমিশনের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিশ্চয়তা।

গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব কোনো সরকারের পছন্দ বা অপছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা নয়; বরং সংবিধান ও ভোটারদের অধিকার অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করা। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রশাসনিক বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করা হলে বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত প্রশাসকদের দায়িত্ব পালনের সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। তাঁর মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বিকল্প হিসেবে অনির্বাচিত প্রশাসকদের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালন করা উচিত নয়।

জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করতে দ্রুত একটি চূড়ান্ত রোডম্যাপ প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ এবং কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

তাঁর আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে নির্বাচনের সময়সূচি ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া, কোনো মন্ত্রণালয় বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কমিশনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ না করা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত না করা। পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা চেয়েছে দলটি।

গোলাম পরওয়ার নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের প্রকাশ্য নিশ্চয়তার দাবিও জানিয়েছেন। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত সরকার-নিয়োগকৃত প্রশাসকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আগে দেওয়া নয় দফা দাবি বাস্তবায়নের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বক্তব্যে বিষয়টিকে সরাসরি কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার আগে তাঁর মন্ত্রণালয় বা সরকারকে অবহিত করা হয়নি। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকাশিত সময়সূচি ছিল প্রাথমিক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।

ফলে বর্তমানে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কমিশন ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রস্তুতিমূলক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। চূড়ান্ত নির্বাচনি সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, নির্বাচনি উপকরণ এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নেওয়ার বিষয় রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠকের কথা রয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা সাধারণ ভোটারদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পরিষদ দেশের স্থানীয় প্রশাসনের সবচেয়ে বিস্তৃত নির্বাচিত কাঠামোগুলোর একটি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে নির্বাচন কখন হবে, কীভাবে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের কাঠামো কখন কার্যকর হবে—এসব প্রশ্ন স্থানীয় জনগণের দৈনন্দিন জীবন ও প্রশাসনিক সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গোলাম পরওয়ার তাঁর বক্তব্যে এ বিষয়টিকেই রাজনৈতিক অধিকার ও স্থানীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা করা কেবল রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি ভোটারদের অংশগ্রহণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে এসব বক্তব্য জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে এসেছে এবং নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এগুলোকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারের চাপের পরিবর্তে সংবিধান ও জনগণের ভোটাধিকারের বিষয়টি সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন পেছানোর যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করার কথাও জানান। পাশাপাশি ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উল্লেখ করেন।

জামায়াতে ইসলামীর এই সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা ও উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে প্রধান বিষয় হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত বিবেচনা করে একটি চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করা। কমিশন জানিয়েছে, এ বিষয়ে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা শেষে পরবর্তী তথ্য জানানো হবে।

শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে এবং কোন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। একই সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির পাশাপাশি ভোটারদের জন্য একটি স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য ও চূড়ান্ত নির্বাচনি সময়সূচি প্রকাশ করাই এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত