প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের পর ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েক বছর ধরে সীমান্ত উত্তেজনা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, বাণিজ্য ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা—এসব বিষয় দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতির ফলে সেই সম্পর্কে সতর্ক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয়। চীনের সরকারি বিবরণে বৈঠকটিকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শি জিনপিং বলেন, চীন ও ভারতের উচিত একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখা। দুই দেশের ভিন্ন জাতীয় বাস্তবতা থাকলেও পারস্পরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অভিন্ন উন্নয়নের সুযোগ তৈরির ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
ভারতের পক্ষ থেকেও সম্পর্কের অগ্রগতির বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। তবে নয়াদিল্লির সরকারি বিবরণে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের বিদ্যমান সীমান্ত চুক্তি ও সমঝোতা মেনে চলার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সম্পর্কের বৃহত্তর কৌশলগত সম্ভাবনা এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রকে সামনে আনা হলেও নয়াদিল্লি একই সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতির বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু দীর্ঘদিনের বিরোধগুলো যে শেষ হয়ে গেছে, এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক ভাষ্যেও ভারতকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদার বা সীমান্ত বিরোধের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার বাইরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বরং ভারতকে বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। চীনা সরকারি বিবরণে দুই দেশের বাণিজ্য, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনা প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে শি ও মোদির মধ্যে একাধিক বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে এগিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হয়েছে এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে। চীনা পক্ষের হিসাবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এসব বিষয় বেইজিংয়ের কাছে সম্পর্কের স্থিতিশীলতার ইতিবাচক সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে ভারতের উদ্বেগের জায়গাগুলোও স্পষ্ট। বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজারে পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে বড় ঘাটতি কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে। ফলে সম্পর্কের রাজনৈতিক উষ্ণতা বাড়লেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রশ্নটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
মানুষে-মানুষে যোগাযোগও নতুন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। দুই পক্ষ সাংস্কৃতিক বিনিময়, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং নাগরিকদের চলাচল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সীমিত যোগাযোগের পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। পর্যটন, শিক্ষা, ব্যবসা এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত হলে তা পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্রিকসের বৃহত্তর কাঠামোও এই সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি করছে। ভারত ও চীন উভয়ই ব্রিকসকে পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে উপস্থাপন করে না। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান—এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে কিছু অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনেও বৈশ্বিক দক্ষিণের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অধিকতর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এখানে ভারতের কৌশলগত অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রিকসের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। কোয়াডের মতো কাঠামোতেও ভারতের ভূমিকা রয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার অর্থ ভারতের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে দেওয়া—এমন সরল সমীকরণ তৈরি হয় না।
বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্রিকস সম্মেলনে ভারত এমন একটি অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব। ফলে ভারত-চীন সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছকে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা এখনো সীমান্ত। ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হয়েছে। সাম্প্রতিক বৈঠকে দুই নেতা সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হলেও সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান এখনো হয়নি। এ কারণে বর্তমান সম্পর্ককে পূর্ণাঙ্গ স্বাভাবিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
বিশ্লেষকদের কাছেও এ কারণেই সাম্প্রতিক পরিবর্তনের মূল্যায়নে সতর্কতা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে, শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক হচ্ছে, ব্যবসা ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের আলোচনা হচ্ছে—এসব ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু সীমান্ত, বাণিজ্য ভারসাম্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে মতপার্থক্য এখনো রয়েছে। ফলে সম্পর্কের উন্নতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে এসব কঠিন প্রশ্নে দুই দেশ কতটা বাস্তব অগ্রগতি করতে পারে তার ওপর।
চীনা পক্ষের ভাষায় ভারত-চীন সম্পর্ককে ‘অংশীদার’ হিসেবে দেখার আহ্বান এবং ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্ত শান্তিকে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা—দুই দেশের অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র দেয়। বেইজিং যেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক ও সহযোগিতার সম্ভাবনা সামনে আনছে, নয়াদিল্লি সেখানে সহযোগিতার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থার শর্তকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে ব্রিকস সম্মেলনের পর ভারত-চীন সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে কি না—এর উত্তর এখনই এক কথায় দেওয়া কঠিন। তবে এটুকু স্পষ্ট যে দুই দেশ আবারও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সম্পর্ককে কেবল বিরোধের জায়গা থেকে দেখার পরিবর্তে সহযোগিতার ক্ষেত্রও সামনে আনছে। একই সঙ্গে সীমান্ত ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সামলানোর প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করা হচ্ছে।
আগামী কয়েক মাসে এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব আরও স্পষ্ট হতে পারে। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ, বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, নাগরিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হলে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উষ্ণতার আরও দৃশ্যমান প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে কোনো বড় সীমান্ত বা কৌশলগত বিরোধ দেখা দিলে বর্তমান অগ্রগতিও চাপে পড়তে পারে।
এই মুহূর্তে তাই ভারত-চীন সম্পর্ককে সম্পূর্ণ পুনর্মিলন বা পুরোনো বিরোধের অবসান হিসেবে না দেখে একটি সতর্ক পুনঃসংযোগের পর্যায় হিসেবে দেখা যায়। ব্রিকস সম্মেলন দুই দেশের নেতাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে এবং সহযোগিতার সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। এখন সেই রাজনৈতিক বার্তা কতটা বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনে রূপ নেয়, সেটিই হবে সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ের মূল প্রশ্ন