প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিউইয়র্ক থেকে: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), বায়োটেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে বিশ্ব নতুন এক যুগে প্রবেশ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এই অগ্রযাত্রার সুফল যেন কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত ও সহজলভ্য করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নির্মাণে বৈশ্বিক সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রসঙ্গটি উঠে আসে এমন এক সময়ে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক গবেষণা, বায়োটেকনোলজি, অটোমেশন এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা বিশ্ব অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দ্রুত পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তন একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনের সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে প্রযুক্তিতে অসম প্রবেশাধিকারকে ঘিরে নতুন ধরনের বৈষম্যের আশঙ্কাও তৈরি করছে। তারেক রহমানের বক্তব্যে তাই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি এর ন্যায়সংগত বণ্টনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এর সুযোগ এখনো বিশ্বের সব মানুষের জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে তিনি দেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেন। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ডিজিটাল বিভাজন নিয়ে সতর্কতা। তিনি বলেন, আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভাজনে পরিণত না হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে যদি উন্নয়নশীল দেশ ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের নতুন মাত্রা তৈরি হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে এআইকে কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও মানবসম্পদের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যু হিসেবে দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কর্মক্ষম বয়সের হওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তিতে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তাও তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। তবে একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এর মাধ্যমে তিনি উন্নত প্রযুক্তির মালিক দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বক্তব্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্পর্কও উঠে আসে।
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফলকে বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি অভিন্ন ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যয় কমিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, এআই এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ থেকে যাতে বিভিন্ন দেশ ইতিবাচকভাবে উপকৃত হতে পারে, সে জন্য জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর ব্যবহারকে ঘিরে যে নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, সেগুলো মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাই তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার বিশ্বব্যাপী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন ও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার, তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ভুল তথ্যের বিস্তার এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব বিষয়ে নীতিগত সমন্বয়ের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তরুণ জনগোষ্ঠী ও ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের কারণে। দেশের তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা গেলে নতুন কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু প্রযুক্তি আমদানি নয়, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা অবকাঠামো এবং মানসম্মত শিক্ষার বিস্তারও প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির সঙ্গে জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে এ বিষয়গুলো সরাসরি সম্পর্কিত।
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলায় দেওয়া এই বক্তব্যে প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ বিশ্বের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি এর সুফলকে মানবিক ও সমতাভিত্তিক করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং দেশকে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্যে প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপায় হিসেবে নয়, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন এবং বৈশ্বিক বৈষম্য কমানোর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রসঙ্গটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল সক্ষমতা সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর যে প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেছেন, তা দেশের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক রূপান্তরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বায়োটেকনোলজি—নতুন নতুন উদ্ভাবন মানুষের জীবন ও অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে প্রযুক্তির মালিকানা ও ব্যবহার যেন কেবল সীমিত কিছু রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ না থাকে, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষও যাতে এর সুযোগ গ্রহণ করতে পারে—জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেই প্রত্যাশাই তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান, যেখানে বিজ্ঞানের অগ্রগতি হবে সবার জন্য এবং প্রযুক্তি বৈষম্য বাড়ানোর পরিবর্তে মানুষের সম্ভাবনা বিকাশের পথ তৈরি করবে।