শনিবার থেকে হামের বিশেষ টিকা, আওতায় ৩৪ লাখ শিশু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
শনিবার থেকে হামের বিশেষ টিকা, আওতায় ৩৪ লাখ শিশু

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হাম প্রতিরোধে বাদ পড়া শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনতে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হচ্ছে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন। ‘ইনটেনসিফায়েড এমআর ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এই বিশেষ কর্মসূচি। আগের টিকাদান কার্যক্রমে যেসব শিশু কোনো কারণে টিকা নিতে পারেনি, তাদের শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনার পাশাপাশি কর্মসূচি চলাকালে ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা শিশুদেরও এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গত ২০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, এবার শুধু নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে মাঠপর্যায়ে গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থাৎ কোনো শিশু যেন আগের কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়ে, সে জন্য বাড়ি ও গ্রাম পর্যায়েও স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে চলতি বছরে দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে এবং আক্রান্ত হলে জটিলতারও আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়। বর্তমান কর্মসূচিটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত সারাদেশে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছিল। ইউনিসেফ, গ্যাভি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত ওই কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০২ থেকে ১০৪ শতাংশ পর্যন্ত টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু শিশু টিকাদানের বাইরে থেকে গেছে কি না, তা যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এরপর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর জাতীয় কর্মসূচিতেও বিপুলসংখ্যক শিশুর তথ্য সামনে আসে। ওই কর্মসূচিতে প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হয়। তখন আগের হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমে প্রায় ৪৩ লাখ শিশু বাদ পড়ার তথ্য পাওয়া যায়। বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে পরে মপ-আপ বা অতিরিক্ত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেই কার্যক্রমের মাধ্যমে এরই মধ্যে আরও প্রায় ১৯ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

তবে এরপরও প্রায় ২৪ লাখ শিশু টিকাদানের বাইরে রয়ে যায়। এর সঙ্গে গত তিন মাসে আরও প্রায় ১০ লাখ শিশু ছয় মাস বয়স পূর্ণ করে টিকা নেওয়ার জন্য নতুন করে উপযুক্ত হয়েছে। ফলে আগের বাদ পড়া শিশু ও নতুন করে টিকার আওতায় আসা শিশু মিলিয়ে এবারের বিশেষ ক্যাম্পেইনে মোট প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই হিসাব শুধু একটি প্রশাসনিক সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে বিপুলসংখ্যক পরিবারের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিবার থাকতে পারে, যাদের সন্তান কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। কখনো টিকাদান কেন্দ্র থেকে দূরত্ব, কখনো পরিবারের অসচেতনতা, আবার কখনো শিশুর অসুস্থতা বা নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে যেতে না পারার কারণে টিকা বাদ পড়তে পারে। বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এসব শিশুকে শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শুধু নির্ধারিত কেন্দ্রেই শিশুদের অপেক্ষায় না থেকে স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শিশুদের টিকাদানের অবস্থা যাচাই করা হবে। যেসব শিশু আগের কর্মসূচিতে টিকা নেয়নি, তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোর কাছেও টিকাদান কার্যক্রম পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এবারের ক্যাম্পেইনের জন্য পর্যাপ্ত টিকা মজুদের কথাও জানিয়েছে সরকার। গত ১০ সেপ্টেম্বর ইউনিসেফের কাছ থেকে আরও ৪৩ লাখ ডোজ হাম-রুবেলা টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর আগে সরকারি মজুতে ছিল ১৫ লাখ ডোজ। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫৮ লাখ ডোজ টিকা রয়েছে। নির্ধারিত ওয়েস্টেজ বিবেচনায় নেওয়ার পরও এবারের ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ডোজের তুলনায় মজুদ পর্যাপ্ত থাকবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

বিশেষ ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরও টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে না। কর্মসূচি চলাকালে কিংবা পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো শিশু ছয় মাস বয়স পূর্ণ করলে তাদের টিকাদানের আওতায় আনতে মপ-আপ কার্যক্রম চালু রাখার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট দিনের কর্মসূচির মধ্যে টিকাদান সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন করে যোগ্য হওয়া শিশুদেরও পরবর্তীতে টিকা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট, পরিচালক, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না এবং টিকার প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে কি না—এসব বিষয়েও নজরদারি থাকবে।

শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষিত রাখতে অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত টিকাদান সূচি অনুযায়ী শিশুকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় অতিরিক্ত ডোজের সুযোগ থাকলে সেটিও গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কোনো শিশু আগের কর্মসূচিতে টিকা নিয়ে থাকলেও তার ক্ষেত্রে বিশেষ ক্যাম্পেইনে কী প্রয়োজন, তা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শিশু বিশেষজ্ঞরাও অভিভাবকদের নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময়ে এমআর টিকা দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় শিশুর বয়স ও টিকাদানের ইতিহাস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিকাদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা থাকলে নিজের মতো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মী বা টিকাদান কেন্দ্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুর টিকা বাদ পড়লে শুধু সেই শিশুই ঝুঁকিতে পড়ে না; একটি এলাকায় অনেক শিশু টিকাবিহীন থাকলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। তাই টিকাদানের মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগের বিস্তার কমানো। এই কারণে টিকাদান কর্মসূচিতে যত বেশি শিশু অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে, হাম নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও তত বেশি কার্যকর হওয়ার সুযোগ থাকবে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত এলাকার কোনো কোনো পরিবার টিকাদান কেন্দ্রের তথ্য বা সময়সূচি সম্পর্কে কম জানতে পারে। আবার অনেক সময় কর্মজীবী অভিভাবকের পক্ষে নির্দিষ্ট দিনে শিশুকে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এবারের কর্মসূচিতে বাড়ি ও গ্রাম পর্যায়ে শিশু শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় এসব বাধা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আগের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং তাদের টিকাদানের আওতায় আনার উদ্যোগকে তাই স্বাস্থ্য বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে নতুন করে ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা প্রায় ১০ লাখ শিশুকে হিসাবের মধ্যে আনা হয়েছে। ফলে এবারের কর্মসূচি শুধু পুরোনো বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; নতুন করে টিকা নেওয়ার উপযুক্ত হওয়া শিশুদেরও এর আওতায় নেওয়া হচ্ছে।

শনিবার সকাল থেকে সারাদেশে শুরু হওয়া এই বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে সফলতা। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতন অংশগ্রহণও হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাম প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রতিটি পরিবারের সচেতন সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর টিকা বাদ পড়ে থাকলে তার তথ্য সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের জানানো, নির্ধারিত সময়ে শিশুকে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়মিত টিকাদান সূচি অনুসরণ করার মাধ্যমে পরিবারগুলো এই জাতীয় কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্যও হচ্ছে—যে শিশুরা আগের কোনো ধাপে বাদ পড়েছে, তাদের আর বাদ না রাখা।

স্বাস্থ্য বিভাগের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিপুলসংখ্যক শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে। ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরও নতুন করে যোগ্য হওয়া শিশুদের জন্য মপ-আপ কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বিশেষ এই টিকাদান কর্মসূচি একদিকে যেমন বর্তমান ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ, অন্যদিকে ভবিষ্যতে কোনো শিশু যেন টিকাদানের বাইরে না থাকে, সেই লক্ষ্যেও একটি ধারাবাহিক কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত