প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মালদ্বীপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা সমস্যা, দাবি ও প্রত্যাশা নিয়ে দেশটির রাজধানী মালেতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে মতবিনিময় করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকালে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কনস্যুলার সেবা এবং দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার বিষয় উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
মতবিনিময় সভাটি এমন একটি সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য নিয়মিত কনস্যুলার সেবা, বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ, দেশে অর্থ পাঠানোর সহজ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন জরুরি সেবার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সভায় অংশ নেওয়া প্রবাসীরা নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে বিদেশের মাটিতে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতার পাশাপাশি সংকটের সময়ে দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহায়তা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ও।
সভায় প্রবাসীদের পক্ষ থেকে দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকিং জটিলতার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ পরিবারের কাছে নিরাপদ ও সহজ উপায়ে পৌঁছানো তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশির পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ নির্ভর করে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর। ফলে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু প্রবাসীর ওপর নয়, দেশে থাকা পরিবারের ওপরও পড়ে।
এ কারণে মতবিনিময় সভায় প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যাংকিং সমস্যাগুলো সহজ করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। এ আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রতিবেদনে মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে সহজ, নিরাপদ ও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেখানে বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের শাখা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।
প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ ছিল মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া। বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশির মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের জন্য সেটি অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতি তৈরি করে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা, যোগাযোগ, পরিবহন ও অর্থনৈতিক ব্যয়ের বিষয় যুক্ত থাকে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা সভায় তুলে ধরেন প্রবাসীরা।
মালদ্বীপে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত বা অবৈধ অবস্থায় পড়েছেন, তাঁদের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রবাসীদের পক্ষ থেকে তাঁদের বৈধ হওয়ার সুযোগ তৈরি করা অথবা যারা দেশে ফিরতে চান, তাঁদের জন্য সহজ ও বাস্তবসম্মত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়। বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বৈধ কাগজপত্র হারালে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নবায়ন করতে না পারলে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সমস্যায় পড়তে পারেন। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি প্রবাসীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
মতবিনিময় সভায় কনস্যুলার সেবার বিষয়টিও উঠে আসে। পাসপোর্ট, ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র, বিভিন্ন প্রত্যয়ন, নথিপত্র সংশোধনসহ নানা প্রয়োজনীয় কাজে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের নিজ দেশের মিশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব সেবা সহজলভ্য, সময়োপযোগী ও কার্যকর হলে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমে। মালদ্বীপে বাংলাদেশ হাইকমিশনও বিভিন্ন সরকারি কনস্যুলার সেবা দিয়ে থাকে। হাইকমিশনের সরকারি ওয়েবসাইটে পাসপোর্ট, ভিসা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবার তথ্যও প্রকাশ করা হয়।
কর্মসংস্থান এবং কথিত সিন্ডিকেটের বিষয়টিও প্রবাসীদের আলোচনায় স্থান পেয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগে থেকে শুরু করে কর্মস্থলে পৌঁছানো পর্যন্ত একজন অভিবাসী শ্রমিক বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে পারেন। কোথাও অতিরিক্ত অর্থ আদায়, কোথাও চাকরির শর্তের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য কিংবা কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে প্রবাসী শ্রমিকরা সমস্যায় পড়েন। সভায় এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবাসীদের বক্তব্য শোনার পর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান তাঁদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। হাইকমিশনের পক্ষ থেকেও বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় অধ্যাপক মুজিবুর রহমান প্রবাসীদের আশ্বস্ত করে বলেন, তাঁদের উত্থাপিত বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয় অংশ জাতীয় সংসদে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো কেবল কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক পর্যায়ে নয়, দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
মালদ্বীপে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবনযাপন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে—প্রবাসীদের সমস্যাগুলো একক কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা, বৈধ অবস্থান, অর্থ পাঠানো, কনস্যুলার সেবা, জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা এবং দেশে ফিরে আসার প্রক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে একটি বিস্তৃত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁদের যেতে হয়। ফলে নিয়মিতভাবে প্রবাসীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতবিনিময় হলে বাস্তব সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মালদ্বীপ সফরের অংশ হিসেবে প্রবাসীদের সঙ্গে আরও মতবিনিময় হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি রাজধানী মালের বৃহত্তর এলাকায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি মাফুশি দ্বীপে কর্মরত প্রবাসীদের সঙ্গেও পৃথক সভায় অংশ নেন। এসব সভায় প্রবাসীরা তাঁদের কর্মজীবন, দৈনন্দিন জীবনযাপন, সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন।
প্রবাসীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা। ঢাকায় বসে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসীদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা অনেক সময় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না। কিন্তু বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হলে কোন সেবা কোথায় জটিল, কোন প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগছে কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় সহায়তার ঘাটতি রয়েছে—এসব বিষয়ে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।
মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য অর্থ পাঠানোর সুযোগ, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, অনিয়মিত অবস্থান থেকে বৈধ হওয়ার সুযোগ, কনস্যুলার সেবা এবং কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সমস্যা তাই শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয় নয়; এগুলো প্রবাসী কল্যাণ, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত। বিশেষ করে যেসব পরিবার প্রবাসী সদস্যের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য বিদেশে কর্মরত স্বজনের নিরাপত্তা ও নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা সরাসরি পারিবারিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মতবিনিময় সভায় আলোচিত বিষয়গুলোর বাস্তব সমাধানে এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন প্রবাসীরা। হাইকমিশনের পক্ষ থেকে যে উদ্যোগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তার অগ্রগতি এবং সংসদে বিষয়গুলো উত্থাপনের পর কী ধরনের আলোচনা ও পদক্ষেপ হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মতবিনিময় সভায় অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ড. মোবারক হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।
মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এই আলোচনা মূলত তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যা ও প্রত্যাশাকে সামনে আনার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। প্রবাসীদের দাবি ও ভোগান্তির বিষয়গুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো এবং সেগুলোর বাস্তব সমাধানে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য সরকারি সেবাপ্রাপ্তি আরও সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এমন সরাসরি মতবিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।