প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট সার্কিট হাউসে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারের ভূমিকা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের দায়িত্ব পালন নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এ সভায় তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন আলোচনা রয়েছে যে সালাহউদ্দিন আহমেদ সরকারের অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর বিষয়ে দায়িত্বশীলভাবে খোঁজখবর রাখলেও নিজের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যথাযথভাবে সামলাতে পারছেন না। তিনি এ মন্তব্যের মাধ্যমে মূলত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাঁর অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন।
সিলেট সফরের অংশ হিসেবে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন জামায়াতের আমির। আলোচনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো—এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, কোন সময়ের পরিস্থিতিকে ‘আগের’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং বর্তমান পরিস্থিতির কোন সূচকে উন্নতি হয়েছে।
শফিকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিজেদের সময়ে ভালো বলে তুলে ধরে। কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অভিজ্ঞতা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে শুধু সরকারি বক্তব্যের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করা যথেষ্ট নয়।
তিনি সাম্প্রতিক একটি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও আলোচনায় আনেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার ছেলের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, হত্যার পর ভুক্তভোগীকেই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্যে প্রশ্ন উঠে আসে, কোনো ব্যক্তি ভুল বা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে হত্যার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যায় কি না।
এই প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, একটি হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত ও জবাবদিহির পরিবর্তে ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হলে প্রকৃত দায় ও ঘটনার কারণ আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তিনি এটিকে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দেশে মাদক ও অস্ত্রের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের আমির। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ আইন ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধেও একইভাবে আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন বলে তিনি বিভিন্ন বক্তব্যে জোর দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সরকারি দলের নেতাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ও সামনে আনেন শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কেউ কেউ নিজেদের মধ্যেই গুরুতর অভিযোগ তুলছেন। তিনি এসব বক্তব্যকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের একটি বক্তব্যের কথাও তুলে ধরেন। শফিকুর রহমান দাবি করেন, ট্রেজারি বেঞ্চে বসে সরকারি দলের ওই নেতা দেশের বড় মাদকের চালান সংশ্লিষ্ট এক নেতার এলাকার মধ্য দিয়ে আসে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্টতার বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণযোগ্য—এমন বিষয়ও রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
মতবিনিময় সভায় শফিকুর রহমানের বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রসঙ্গ। একজন নাগরিকের জন্য নিরাপদে বাড়ি থেকে বের হওয়া, কর্মস্থলে যাওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—এমন অবস্থানের কথা তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকারি পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর নয়, সামগ্রিক সামাজিক আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। একটি হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা কোনো একটি পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি আশপাশের মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এ কারণে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত তদন্ত, অপরাধীর পরিচয় শনাক্তকরণ এবং আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে রাজনৈতিক জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, সরকার বা প্রশাসনের কোনো অংশ নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করেন।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দাবিগুলোকে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য যথাযথ তদন্ত, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, মাদক বা হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তদন্তের ফলাফল ও আইনগত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট সার্কিট হাউসের এ মতবিনিময় সভায় স্থানীয় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামী সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার শীর্ষস্থানীয় নেতারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন। দুই দিনের সিলেট সফরের অংশ হিসেবে শফিকুর রহমান বিভিন্ন দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে এই মতবিনিময় এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারের কার্যক্রম এবং জননিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দলের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে শফিকুর রহমান সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তাঁর মন্তব্যও মূলত এই বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা বিতর্কের অংশ হিসেবে এসেছে। তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তার কেন্দ্রবিন্দু হলো—দেশের নিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষ সেই কার্যক্রমের সুফল কতটা অনুভব করছে।
রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটি অবশ্য আরও সরল। মানুষ নিরাপদ পরিবেশে চলাফেরা করতে চায়, পরিবার ও সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় এবং অপরাধের শিকার হলে দ্রুত বিচার ও প্রতিকার প্রত্যাশা করে। এসব প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সেই জননিরাপত্তা ও জবাবদিহির বিষয়গুলোই গুরুত্ব পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে তাঁর সমালোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে। তবে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রশ্নগুলোর বাস্তব মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তথ্য এবং বিভিন্ন ঘটনার তদন্তের ফলাফলের ওপর।