উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ জামায়াতের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ জামায়াতের

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকাগুলোকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দল এ বিষয়ে কথা বললে অন্য কোনো খাত থেকে তুলনামূলকভাবে সামান্য বরাদ্দ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন বরাদ্দ, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বক্তব্য, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার বিষয়েও দলের অবস্থান তুলে ধরেন।

নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দ প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পরদিন গত ১৩ অক্টোবর স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের ২০৩টি আসনে ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, সংসদ সদস্যদের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকল্পে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। তবে এ বরাদ্দে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকাগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের এই নেতা আরও দাবি করেন, সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের বাছাই করা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আরও ৩২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ধরনের সিদ্ধান্তকে তিনি উন্নয়ন কার্যক্রমে রাজনৈতিক বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বরাদ্দ কোনো দলের সংসদ সদস্যের জন্য আলাদা হওয়া উচিত নয়। একটি নির্বাচনী এলাকার মানুষের উন্নয়ন প্রয়োজন দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য যে দলেরই হোন না কেন, তাঁর এলাকার নাগরিকদের সমানভাবে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সরকারি বরাদ্দের সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল রূপক অর্থে বলেন, বিরোধী দল কথা বললে তাদের এক খাত থেকে সামান্য বরাদ্দ দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হয়, আর সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের দেওয়া হচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। তাঁর ভাষায়, বিরোধী দলকে ‘চকলেট দিয়ে খুশি’ করা হলেও অন্যরা ‘বিরিয়ানি’ খাচ্ছে। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি উন্নয়ন বরাদ্দে দুই ধরনের নীতির অভিযোগ সামনে আনেন।

সংবাদ সম্মেলনে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন অনুষ্ঠানেও বিরোধী দলের অনুপস্থিতির বিষয়টি উঠে আসে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়নি বলেই বিরোধীদলীয় নেতা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। তাঁর দাবি, বিষয়টিকে রাজনৈতিক অনুপস্থিতি হিসেবে দেখার আগে অনুষ্ঠানের আয়োজনে বিরোধী পক্ষকে কী ধরনের সম্মান ও ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। গতকাল রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগের কথা বলেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ পাঠাচ্ছে এবং অন্য পক্ষ দেশের রাজপথে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

তবে ওই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, নিজেদের দলীয়করণ, ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বিষয় আড়াল করার জন্য সরকার বিরোধী দলের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ তুলছে। তাঁর দাবি, ‘জুজুর ভয়’ দেখিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, বিরোধী দল কোনোভাবেই ফ্যাসিস্ট শক্তিকে দেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে না। বরং বিরোধী দলের রাজনৈতিক আন্দোলনকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে সরকারই এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ পেতে পারে। তাঁর বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়টি আবারও সামনে আসে।

সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের প্রসঙ্গেও কথা বলেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি এসব পদত্যাগকে সরকারের অভ্যন্তরে অস্থিরতার লক্ষণ বলে মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘হাস্যকর’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দুর্বলতা আড়াল করতে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেওয়া হতে পারে, কিন্তু তারও একটি সীমা থাকা প্রয়োজন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের জবাবও দেন গোলাম পরওয়ার। গত রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে রিজভী জামায়াতের আমিরের কাছে ‘ফ্যাসিস্টদের পথ’ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের শাসনের মাধ্যমে ফ্যাসিজমের অভিজ্ঞতা পেয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।

জুলাই আন্দোলন ও জুলাই সনদ নিয়েও জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জামায়াতসহ ১১টি দল জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করছে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করছে না বলেই গণভোটের বিষয়ে আপত্তি বা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনাকে তিনি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাস রয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত ছিল।

গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, বিচারের আগে সরকারের কাছে সংশ্লিষ্ট তথ্য পৌঁছানোর কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দূতাবাস বিষয়টি আগে জানতে পারেনি এবং সরকারকেও অবহিত করা হয়নি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর সরকারের বিষয়টি জানার অভিযোগ তুলে তিনি কূটনৈতিক তৎপরতার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গুরুতর আইনি জটিলতায় পড়লে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের দায়িত্ব শুধু তথ্য জানানো নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ নিশ্চিত করাও। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর বিষয়ে আগেভাগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আবদুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ অন্য নেতারা ছিলেন।

জামায়াতের এই সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ সামনে এসেছে, অন্যদিকে দেশের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও দলটির অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দলীয় পরিচয়ের প্রভাব রয়েছে কি না, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের বণ্টনে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কতটা বজায় থাকছে—এসব প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে জামায়াতের অভিযোগের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একটি নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প সরাসরি সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। সড়ক, অবকাঠামো, যোগাযোগ, জনসেবা ও স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দলীয় রাজনীতির বাইরে সাধারণ নাগরিকদের ওপরই পড়ে।

রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেও তাই উন্নয়ন বরাদ্দের স্বচ্ছতা, সমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি গুরুত্ব পাচ্ছে। কোন নির্বাচনী এলাকায় কত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কোন প্রকল্পের জন্য দেওয়া হয়েছে এবং কী প্রক্রিয়ায় প্রকল্পগুলো নির্বাচন করা হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে বিতর্কের অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। উন্নয়ন বরাদ্দে রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক, জুলাই সনদ ও গণভোটের বাস্তবায়ন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বিদেশে বাংলাদেশিদের আইনি নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com