এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি ঠেকাতে সিম যাচাই

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি ঠেকাতে সিম যাচাই

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি দেশের নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয়পত্র। ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ, পাসপোর্ট তৈরি, মোবাইল সংযোগ, জমি-জমা ও আর্থিক লেনদেনসহ নানা কাজে এনআইডির তথ্য ব্যবহার করা হয়। ফলে এই পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সামান্য অনিয়মও একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমন বাস্তবতায় এনআইডি সংশোধনের আবেদনে জালিয়াতি ও অননুমোদিত হস্তক্ষেপ ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নতুন ব্যবস্থার আওতায় এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে কমিশন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিটিআরসির তথ্যভান্ডারের সঙ্গে প্রযুক্তিগতভাবে সংযোগ স্থাপন করা গেলে আবেদন করার সময় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের নামে নিবন্ধিত কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ফলে অন্যের নামে নিবন্ধিত নম্বর ব্যবহার করেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, এই সুযোগের অপব্যবহার করে প্রতারক বা অসাধু চক্র কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই এনআইডি সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এনআইডি সংশোধনের বর্তমান ব্যবস্থায় ফেস ভেরিফিকেশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে আবেদনকারীর পরিচয় যাচাইয়ের একটি প্রযুক্তিগত ধাপ সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও কমিশনের দৃষ্টিতে শুধু এই ব্যবস্থাই সব ধরনের জালিয়াতি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কেউ যাতে অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে আবেদন করতে না পারে, সে জন্য আবেদনকারীর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের মালিকানাও যাচাইয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ইসির এনআইডি অনুবিভাগের সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন জানিয়েছেন, নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষ হওয়ার পর এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থাটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি; বরং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের কাজ চলছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থা চালু হলে এনআইডি সংশোধনের আবেদনের ক্ষেত্রে আবেদনকারী ও মোবাইল নম্বরের মালিকানার মধ্যে সরাসরি মিল থাকা প্রয়োজন হবে। এতে অন্য ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কারও এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে। একই সঙ্গে আবেদনকারী নিজেই তার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আবেদন করছেন কি না, সেটিও যাচাইয়ের একটি অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমানে একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে একাধিক এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একটি নম্বর দিয়ে বর্তমানে সর্বোচ্চ আটটি এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা যায়। তবে নতুন ব্যবস্থা চালু হলে একজনের এনআইডি সংশোধনের আবেদনের সঙ্গে তার নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার বর্তমান সুযোগ আর থাকবে না।

এ উদ্যোগের ফলে সাধারণ নাগরিকদের জন্য এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের গুরুত্বও বাড়বে। কারও এনআইডিতে ভুল তথ্য থাকলে সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিজের পরিচয় ও মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। এতে অন্যের হয়ে আবেদন করা, পরিচয় গোপন করে তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা কিংবা কোনো ব্যক্তির অজান্তে তার পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করার ঝুঁকি কমতে পারে।

তবে দেশের অনেক নাগরিকের মোবাইল নম্বর নিজের নামে নিবন্ধিত না থাকার বিষয়টিও কমিশনকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করেন—এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। আবার অনেক বয়স্ক নাগরিক বা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত ব্যক্তিও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করেন। তাই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে প্রকৃত সেবাগ্রহীতারা যাতে অযথা সমস্যায় না পড়েন, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়টিও আলাদাভাবে বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন। প্রবাসী নাগরিকদের অনেকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোবাইল নম্বর ব্যবহার, সিমের মালিকানা বা সরাসরি সেবা গ্রহণের বিষয়টি দেশের ভেতরে থাকা নাগরিকদের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। এ কারণে বিদেশে থাকা নাগরিকদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে ভাবছে কমিশন। নতুন পদ্ধতি চালুর আগে এই শ্রেণির নাগরিকদের জন্য কীভাবে আবেদন প্রক্রিয়া সহজ রাখা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

শুধু মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের মধ্যেই এনআইডি সেবা ব্যবস্থার পরিবর্তন সীমাবদ্ধ থাকছে না। এনআইডি নিবন্ধন ও সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও তথ্যনির্ভর করতে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিস্টেমের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস বা এপিআই ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে কমিশন।

এই আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা কার্যকর হলে এনআইডি সংশোধনের সময় নাগরিককে বারবার বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করে জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডার থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হলে যাচাই প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত হতে পারে। একই সঙ্গে ভুল বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে।

এপিআই সংযোগের আলোচনায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদপ্তরের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন বিভাগ। এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য এনআইডি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলে নাগরিকের বিভিন্ন পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

এখানে তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নাগরিকের এনআইডি তথ্যের সঙ্গে তার মোবাইল নম্বর, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, শিক্ষা, বিবাহ বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেজের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব তথ্যের নিরাপদ ব্যবহার, অনুমোদিত প্রবেশাধিকার এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ দ্রুত সেবা দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য যেন অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে না যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এনআইডি সংশোধন ব্যবস্থায় পরিচয় যাচাইয়ের আরও একটি স্তর যুক্ত হবে। এতে নাগরিকের নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির তথ্য—একাধিক উৎসের মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে জালিয়াতির সুযোগ কমানোর পাশাপাশি এনআইডি সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের আগে সাধারণ নাগরিকদের জন্য বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানানো প্রয়োজন হবে। কারা আবেদন করতে পারবেন, নিজের নামে মোবাইল নম্বর না থাকলে কী করতে হবে, বিদেশে থাকা নাগরিকরা কীভাবে আবেদন করবেন এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার ক্ষেত্রে কোথায় সহায়তা পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমবে।

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য একজন নাগরিকের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই এই তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া যেমন সহজ ও দ্রুত হওয়া প্রয়োজন, তেমনি তা হতে হবে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য। জালিয়াতি ঠেকাতে নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ সেই নিরাপত্তা জোরদারের একটি নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন বিটিআরসির সঙ্গে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সমন্বয় শেষ করে নির্বাচন কমিশন কীভাবে এবং কখন এই ব্যবস্থা কার্যকর করে, সেটিই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com