রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কমনওয়েলথের সমর্থন চায় বাংলাদেশ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কমনওয়েলথের সমর্থন চায় বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মিয়ানমারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান শান্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং উদীয়মান প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কমনওয়েলথের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার রাজধানী সেন্ট জনসে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের রিট্রিট অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে এসব বিষয় তুলে ধরেন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। ৫৬টি কমনওয়েলথ সদস্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা এ বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিনের একটি বড় মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ। ২০১৭ সালের পর থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে কক্সবাজার ও ভাসানচরের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে। প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে শরণার্থী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি তাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ঢাকার অবস্থান হলো, দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নয়, বরং মিয়ানমারেই নিহিত। সেই কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরছে বাংলাদেশ।

কমনওয়েলথ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি দেশের মানবিক সমস্যা হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। কমনওয়েলথের সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত সমর্থন থাকলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আরও জোরালো হতে পারে—এমন প্রত্যাশা বাংলাদেশের।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে শুধু ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মহলেও একই নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে বর্তমানে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ বিদ্যমান নেই। ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে। শরণার্থীদের খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে আশ্রয়শিবিরের আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ২০২৬ সালের যৌথ সাড়া পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টিও বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়ের কারণে যে আর্থিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা শুধু বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছে ঢাকা।

কমনওয়েলথের বৈঠকে হুমায়ুন কবির শুধু রোহিঙ্গা সংকট নয়, বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ নিয়েও সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং উদীয়মান প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় এসব ক্ষেত্রে এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়—এমন বাস্তবতার মধ্যেই বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি ও লোকসানের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ বাড়াতেও একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য কমনওয়েলথভিত্তিক সহযোগিতা বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।

এদিকে কমনওয়েলথের বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে চলমান রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশ একই সঙ্গে একটি বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়গুলো ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।

হুমায়ুন কবির ১ থেকে ৪ নভেম্বর অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে দেশটি সফর করছেন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। কমনওয়েলথের এবারের সম্মেলনকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এরই মধ্যে সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের আলোচনাতেও রোহিঙ্গা ইস্যু উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টির প্রশংসা করে রোহিঙ্গাদের জন্য ব্রিটিশ মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন এবং মানবিক সহায়তার মতো বহুপক্ষীয় বিষয়েও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও চলমান সংঘাতের কারণে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। মিয়ানমারও জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তারা কাজ করবে।

এই অবস্থায় বাংলাদেশ চাইছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু মানবিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ সমাধানেও আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখুক। কারণ শরণার্থীদের বছরের পর বছর আশ্রয় দিয়ে যাওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত শর্ত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরার পথ তৈরি করাই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল ভিত্তি।

কমনওয়েলথের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের এই আহ্বান তাই শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; দীর্ঘস্থায়ী একটি মানবিক সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় করার প্রচেষ্টার অংশ। সামনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো কতটা সমন্বিত অবস্থান নেয় এবং মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে কী ধরনের ভূমিকা রাখে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com