প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামোতে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যকে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছে দলটি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দলটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের কোনো অংশগ্রহণ নেই—টিআইবির প্রতিবেদনে এমন যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা সঠিক নয়। বরং দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা, সাংগঠনিক কাঠামো, জবাবদিহি, নারী ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণসহ নানা বিষয়ে তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অংশগ্রহণ নেই বলে উল্লেখ করা হয়। এই তথ্য প্রকাশের পর দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী তার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা করে থাকে। তাঁর দাবি, দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়সহ বিভিন্ন স্তরে নারীদের কার্যক্রম এবং সাংগঠনিক কমিটি রয়েছে। ফলে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে নারীদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিকে তিনি বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী সদস্য রয়েছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় নারী সদস্যের সংখ্যা ১২২ জন বলে তিনি দাবি করেছেন। দলের রুকন বা সদস্যদের মধ্যেও নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াতের রুকনদের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী।
গোলাম পরওয়ারের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সামনে এসেছে। একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নারীদের অবস্থান কতটা, কোন কাঠামোর মাধ্যমে তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত এবং সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে—এসব প্রশ্ন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নারীদের জন্য দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও কমিটি রয়েছে এবং তাঁরা সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে টিআইবির গবেষণায় জামায়াতের নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা দলটির নিজস্ব তথ্যের সঙ্গে মিলছে না বলে দাবি করেছে জামায়াত।
মিয়া গোলাম পরওয়ার টিআইবির মতো একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জামায়াতকে নিয়ে কোনো গবেষণা, প্রতিবেদন বা প্রকাশনা তৈরির আগে সংগঠনটির প্রকৃত সাংগঠনিক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, তথ্যগত অসঙ্গতি থাকলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, পাঠক ও সাধারণ মানুষের কাছেও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
জামায়াতের এই প্রতিবাদ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো, নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য এবং স্বাধীনভাবে সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা কীভাবে যাচাই করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে।
বিশেষ করে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের আলোচনার বিষয়। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার, রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে নারীদের অবস্থান কতটা শক্তিশালী, তাঁরা কতটা কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারেন এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে তাঁদের সুযোগ কতটা—এসব বিষয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বিবেচনা করা হয়।
এই বাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কাঠামোতে নারীদের উপস্থিতি আছে কি না, থাকলে তাঁদের সংখ্যা ও দায়িত্ব কী—এ ধরনের তথ্য শুধু পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং নারী সদস্যদের ভূমিকার প্রশ্নও। ফলে টিআইবির প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে জামায়াতের প্রকাশ্য আপত্তি বিষয়টিকে আরও আলোচনার মধ্যে নিয়ে এসেছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে দেওয়া সংখ্যাগুলো অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য থাকার দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে রুকনদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী থাকার কথাও বলা হয়েছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে দলটি বোঝাতে চেয়েছে যে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়েও তাঁদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
অন্যদিকে টিআইবির প্রতিবেদনে কী ধরনের তথ্য ও কোন পদ্ধতির ভিত্তিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি নিয়ে দলটির পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং কোন সাংগঠনিক কাঠামোকে ‘কেন্দ্রীয় কমিটি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে—এসব বিষয় তথ্যের পার্থক্যের কারণ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট গবেষণার পদ্ধতি ও উভয় পক্ষের তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বিবৃতিতে টিআইবির প্রতিবেদনকে অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে প্রতিবেদন বা প্রকাশনা তৈরির ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক দল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার এ ধরনের মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক পরিবেশে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। একটি পক্ষ যখন কোনো তথ্যকে ভুল বা বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করে, তখন সংশ্লিষ্ট তথ্যের উৎস, সংজ্ঞা ও প্রমাণ নিয়ে স্বচ্ছ আলোচনা জরুরি হয়ে ওঠে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবস্থান পরিষ্কার হয় না, সাধারণ মানুষের কাছেও তথ্যের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে বাংলাদেশের বাস্তবতা বহুস্তরীয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেই নারীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম রয়েছে, তবে প্রতিনিধিত্বের মাত্রা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। তাই কোনো একটি দলের নারী সদস্যসংখ্যা বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বের তথ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যাগত উপস্থিতি নয়, তাঁদের প্রকৃত দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জামায়াতের বর্তমান প্রতিবাদ সেই বৃহত্তর আলোচনাকেই সামনে এনেছে। দলটির দাবি অনুযায়ী, নারীরা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্তরে যুক্ত রয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়েও তাঁদের সদস্যপদ রয়েছে। অন্যদিকে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ফলে বিষয়টির বাস্তবতা নির্ধারণে তথ্যের উৎস ও সাংগঠনিক কাঠামোর সংজ্ঞা পরিষ্কারভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন এবং দলটির পাল্টা বক্তব্যের মধ্যকার এই পার্থক্য রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে চলমান আলোচনাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং গবেষণার পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা হলে বিতর্ক কমার পাশাপাশি জনসাধারণের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তব সাংগঠনিক চিত্র আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত