বেরোবির উপাচার্যের দপ্তরে কর্মকর্তাদের সংঘর্ষ, আহত ১

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
বেরোবির উপাচার্যের দপ্তরে কর্মকর্তাদের সংঘর্ষ, আহত ১
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্যের দপ্তরের ভেতরে কর্মকর্তাদের মধ্যে মারামারির ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র উপাচার্যের কার্যালয়েই এমন ঘটনা ঘটায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরাজমান সম্পর্ক, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় বাংলা বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. রফিকুল ইসলাম আহত হয়েছেন। তাঁকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা ফোরামের সভাপতিসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাঁদের মধ্যে কেবল ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

গত বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলীর দপ্তরে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হলেও একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে তা শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঘটনার পর আহত রফিকুল ইসলামের চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায় এবং সেখান থেকে রক্ত ঝরছিল। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে, তাও উপাচার্যের কার্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটায় সংশ্লিষ্ট মহলে বিস্ময় ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ইতিহাস বিভাগের দুই শিক্ষককে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ চিঠি আদান-প্রদানের একটি বিষয় নিয়ে উপাচার্যের দপ্তরে আলোচনা চলছিল। আলোচনায় ইতিহাস বিভাগের দুই শিক্ষক মনিরুজ্জামান ও ইউসুফের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চিঠি পাঠানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকার প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ সময় বাংলা বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দাপ্তরিক চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং এ ধরনের চিঠি ভবিষ্যতে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে তিনি কথা বলছিলেন।

আলোচনার একপর্যায়ে তাঁকে কথা বলতে নিষেধ করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। কে কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কতটুকু এবং আলোচনায় জ্যেষ্ঠতা কীভাবে বিবেচিত হবে—এসব বিষয় নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয় বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, কথার লড়াই দ্রুত ব্যক্তিগত বিরোধের দিকে মোড় নেয়। পরে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

আহত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আলোচনার সময় তিনি মূলত দাপ্তরিক চিঠি পাঠানোর নিয়ম ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইতিহাস বিভাগের দুই শিক্ষকের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চিঠি আদান-প্রদান নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সেখানে কারা এসব চিঠি পাঠাচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার কোনো নিয়ম বা জবাবদিহি রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য বিষয়টির একটি সমাধান হওয়া দরকার বলেও তিনি মত দেন।

রফিকুল ইসলামের দাবি, আলোচনার একপর্যায়ে তারেক নামের এক কর্মকর্তা তাঁকে উদ্দেশ করে জ্যেষ্ঠতা ও কনিষ্ঠতার বিষয়টি উল্লেখ করেন। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ করেন, সংস্থাপন শাখা-২-এর শাখাপ্রধান ড. জিয়াউল হক, সংস্থাপন শাখা-১-এর শাখাপ্রধান তারিকুল ইসলাম, শারীরিক শিক্ষা দপ্তরের পরিচালক মামদুদুর রহমান, রিসার্চ অফিসার রোকনুজ্জামান এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তা লাবু তাঁকে মারধর করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে তিনি চোখের নিচে আঘাত পান এবং রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে যেতে হয়।

তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা রফিকুল ইসলামের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তাঁদের বক্তব্য, দুই শিক্ষকের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার মাঝখানে রফিকুল ইসলাম কথা বলায় তাঁকে বিরত থাকতে বলা হয়। পরে তিনি তাঁদের দিকে আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে আসেন বলে দাবি করেন অভিযুক্তরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁরা তাঁকে বাধা দেন এবং একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। তবে তাঁরা কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন।

দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার বিবরণ নিয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। আহত কর্মকর্তা যেখানে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তুলেছেন, সেখানে অভিযুক্তরা ঘটনাটিকে ধাক্কাধাক্কি হিসেবে বর্ণনা করছেন। ফলে সংঘর্ষের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, কারা এতে সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং কী ধরনের শারীরিক আঘাতের ঘটনা ঘটেছে—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের বাইরে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য, উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং দপ্তরের পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এদিকে ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক মাসুদ রানাকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ইসমাইল হোসেন। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা হলে ঘটনার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে প্রশাসনের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মাসুদ রানা জানিয়েছেন, আগামী রোববার কমিটির সদস্যরা বৈঠকে বসবেন। ওই বৈঠকে তদন্তের কর্মপদ্ধতি ও পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করা হবে। তদন্তের আওতায় কার কার বক্তব্য নেওয়া হবে, প্রত্যক্ষদর্শীদের কীভাবে শনাক্ত করা হবে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য কীভাবে যাচাই করা হবে—এসব বিষয় কমিটির বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে। তবে তদন্তের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে কমিটির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা জানানো হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে কমিটি করেছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রশাসন কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের আগ্রহের বিষয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান নয়; এর প্রশাসনিক কাঠামোও শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে পেশাগত সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নিয়মতান্ত্রিক যোগাযোগ না থাকলে তার প্রভাব দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক পরিবেশেও পড়তে পারে। বিশেষ করে উপাচার্যের দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কোনো বিরোধ শারীরিক সংঘর্ষে গড়ালে তা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে।

দাপ্তরিক বিষয়ে মতবিরোধ বা প্রশ্ন তোলা প্রশাসনিক কাজের স্বাভাবিক অংশ। কোনো সিদ্ধান্ত, চিঠি আদান-প্রদান কিংবা দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো কর্মকর্তা আলোচনায় অংশ নিলে তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করা জরুরি। জ্যেষ্ঠতা ও পদমর্যাদার বিষয় থাকলেও তা যেন পারস্পরিক সম্মান ও দাপ্তরিক শৃঙ্খলার সীমা অতিক্রম না করে, সেটি নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এ ঘটনায় আহত কর্মকর্তা চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁর অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য শোনার মাধ্যমে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তে যেন কোনো পক্ষের পদ, পরিচয় কিংবা সাংগঠনিক অবস্থান প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মান ও অধিকার সুরক্ষাও সমানভাবে জরুরি।

সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। এখন তদন্ত কমিটির কাজ হবে ঘটনার প্রতিটি পর্যায় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট প্রতিবেদন তৈরি করা। তদন্তের ফলাফল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে এ ঘটনায় পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর যোগাযোগ, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা কতটা জোরদার করা হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বেরোবির এই ঘটনা তাই কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় নয়; এটি একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিবেশ ও পেশাগত আচরণের প্রশ্নও সামনে এনেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটিত হোক, আহত কর্মকর্তা ন্যায়বিচার পান এবং সংশ্লিষ্ট সবাই তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার ন্যায্য সুযোগ পান—এটাই এখন প্রত্যাশা। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে ঘটনার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com