প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শাটল ট্রেন শিক্ষার্থীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনরেখার মতো পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত। প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর জন্য এই ট্রেনে নির্ভরশীল। তবে দীর্ঘদিন ধরে শাটল ট্রেনের জীর্ণ অবস্থা, অতিরিক্ত ভিড়, গরম ও ধুলাবালির কারণে শিক্ষার্থীরা যাতায়াতে বিপুল অসুবিধার মুখোমুখি হন। বর্তমানে ব্যবহৃত ট্রেনগুলো দীর্ঘদিনের পুরানো, জীর্ণ ও ভগ্নদশায় রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মতে, এটি আধুনিকায়নের এখন সময় এসেছে।
শিক্ষার্থীরা আশা প্রকাশ করেছেন, আসন্ন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে যারা জয়ী হবেন, তারা শাটল ট্রেনকে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিকভাবে রূপান্তরিত করবেন। তাদের দাবি, এমনভাবে ট্রেন পরিচালনা করা হোক যাতে সবার জন্য আসন নিশ্চিত হয় এবং যাত্রা নিরাপদ ও আরামদায়ক হয়। যারা এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন, তাদেরকেই শিক্ষার্থীরা ভোটে সমর্থন দেবেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি বাস্তবায়ন করতে হলে নতুন বগি সংযোজন প্রয়োজন। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, একটি আধুনিক বগির দাম প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা। একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক শাটল ট্রেনে অন্তত ১৫টি বগি থাকা দরকার, যার খরচ হবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা। তবে বিদ্যমান লোকোমোটিভ ব্যবহার করলে খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব, শুধু নতুন বগি সংযোজন করলেই হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ব্যয় রাষ্ট্রের শিক্ষা বাজেটের ভেতরে সামঞ্জস্য করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সম্মানজনক যাতায়াত নিশ্চিত করা একটি মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হচ্ছে। পাশাপাশি, শাটল ট্রেন আধুনিকায়ন হলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত আরও আরামদায়ক, সময়সাশ্রয়ী এবং মর্যাদাপূর্ণ হবে। এতে ভিড় ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এমন একটি আধুনিক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উদাহরণস্বরূপ মডেল হয়ে উঠতে পারে, যা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও অনুকরণীয় হবে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সুবক্তগীন বলেন, সরকার চাইলে নতুন ট্রেন সংযোজন করা সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, “সরকার উদ্যোগ নিলে আমরা নতুন বগি সংযোজনের মাধ্যমে শাটল ট্রেন সরবরাহে কোনো বাধা সৃষ্টি করব না। এটি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।”
শিক্ষার্থীরা এই মুহূর্তে শাটল ট্রেনের আধুনিকায়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে তুলে ধরছেন। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিলা বেগম বলেন, “শাটল ট্রেনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর ও অস্বস্তিকর। গরম, ধুলাবালি ও অতিরিক্ত ভিড় আমাদের পড়াশোনার পরিবেশকে ব্যাহত করে। সবার জন্য আসন নিশ্চিত হলে স্বস্তি ফিরে আসবে।”
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন সিরাজী বলেন, “দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই যারা শিক্ষার্থীবান্ধব পদক্ষেপ নেবে। শাটল ট্রেনের আধুনিকায়ন, আবাসন সংকট সমাধান, চবি মেডিকেল আধুনিকায়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি পাঁচ বছর ধরে ক্যাম্পাসে রয়েছি। ৫ আগস্টের আগের এবং পরের পরিস্থিতি দেখেছি। আমি চাই না সেই সময়ের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি আবার ফিরে আসুক। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখবে।”
ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা শারমিন লিজা বলেন, “আমরা এমন কাউকে চাকসু চাই, যারা আমাদের আবাসন সংকট ও যাতায়াত সমস্যা—এ দুটি সঠিকভাবে সমাধান করতে সক্ষম।”
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাশেদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মান্ধাতার আমলের সিস্টেম এখনও চালু আছে। এগুলো ডিজিটালাইজ করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক ভবনের দাপ্তরিক কাজ এবং ব্যাংকে টাকা জমা ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হয়। আমরা চাই এই সমস্যার অবসান হোক। যারা এসব সমস্যা সমাধান করতে পারবে, তাদের আমরা ভোট দেব।”
শিক্ষার্থীদের মতে, শাটল ট্রেন আধুনিকায়ন করা হলে কেবল যাতায়াত সুবিধা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষার মানও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ট্রেনের আধুনিকীকরণ দেশীয় রেলওয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এটি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উদাহরণ স্থাপন করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, এবারের চাকসু নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, কার্যকর নেতৃত্ব, নতুন উদ্যোগ এবং সমস্যার সমাধানের পরিকল্পনা ছাড়া ক্যাম্পাসের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশে পরিবর্তন আনাকে সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা চাচ্ছেন, নতুন নেতৃত্ব শাটল ট্রেনের সমস্যা সমাধান ছাড়াও আবাসন ব্যবস্থা উন্নয়ন, শিক্ষার মান বৃদ্ধিসহ ক্যাম্পাসের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও মনোযোগ দেবে। তারা চাইছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্র সংসদের মধ্যে সমন্বয় থাকুক এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার রক্ষা পাবে।
এই প্রসঙ্গে, শিক্ষার্থীরা সতর্ক করে বলেছেন, যিনি শাটল ট্রেনসহ শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করবেন, তার পক্ষেই তাদের ভোট যাবে। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা সরকারের এবং ছাত্র নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।