ইসলামি দৃষ্টিতে সহনশীলতার শিক্ষা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১০০ বার
ইসলামি দৃষ্টিতে সহনশীলতার শিক্ষা

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের নগর থেকে গ্রাম—প্রায় সর্বত্রই মসজিদের পরিবেশে ছোট শিশুদের উপস্থিতি দেখা যায়। অনেক অভিভাবক সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে জামাতে অংশগ্রহণ করতে আসেন। কিন্তু শিশুদের স্বাভাবিক দৌড়ঝাঁপ, কোলাহল বা কান্নাকাটি অনেক সময় নামাজরত মুসল্লিদের মধ্যে অস্বস্তি বা বিরক্তি তৈরি করে। কারও কারও রূঢ় আচরণ কিংবা উঁচু স্বরে তিরস্কার শিশুদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। অথচ ইসলাম শিশুদের মসজিদে আনা নিষিদ্ধ করেনি; বরং তাদের শৈশব থেকেই আল্লাহর ঘরের পরিবেশে বড় হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে দেখা যায়, নবী করিম (সা.) নিজেই শিশুদের মসজিদে এনেছেন এবং তাদের প্রতি দয়া ও মমতা প্রদর্শন করেছেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য ছোটবেলা থেকেই তাদের ঈমান ও দ্বীনের পথে গড়ে তোলার দায়িত্ব বাবা-মায়ের ওপর ন্যস্ত। সুরা আত-তাহরিমে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” (আয়াত ৬)। এই আয়াত থেকেই বোঝা যায়, সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই মসজিদের পরিবেশে পরিচিত করা তাদের আখলাক ও ইবাদতের সঙ্গে জড়িত একটি মৌলিক দায়িত্ব।

সুরা ত্ব-হায় আল্লাহ আবারও বলেছেন, “তুমি তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেও এতে অবিচল থাকো।” (আয়াত ১৩২)। অর্থাৎ পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে ইবাদতে অভ্যস্ত করানো ইসলামি দায়িত্ব। শিশুদের মসজিদে আনা তাই শুধু একটি পারিবারিক অভ্যাস নয়, বরং তা দ্বীনি শিক্ষার মৌলিক অংশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের মসজিদে আনার ব্যাপারে অসংখ্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী করিম (সা.)-কে দেখেছেন নামাজে নাতনি উমামাহকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়াতে। রুকুতে গেলে তাঁকে নামিয়ে দিতেন, আবার দাঁড়ালে কোলে তুলে নিতেন। (আবু দাউদ, হাদিস ১৮২)। এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে শিশুদের উপস্থিতি কোনো বাধা নয়, বরং তাদের নিয়ে ইবাদতে অংশ নেওয়া ইসলাম অনুমোদিত করেছে।

আরেকটি হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী করিম (সা.) নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিশুদের কান্না শুনে সালাত সংক্ষিপ্ত করতেন। তিনি বলতেন, “আমি দীর্ঘ সালাত আদায় করতে চাই, কিন্তু শিশুর কান্না শুনে তা সংক্ষিপ্ত করি, কারণ আমি চাই না তার মাকে কষ্টে ফেলতে।” (বুখারি, হাদিস ৬৭৫)। এতে প্রমাণিত হয়, শিশুদের প্রতি মমতা দেখানো ইমামের জন্যও একটি সুন্নত।

খুতবার সময়ও নবী করিম (সা.) শিশুদের গুরুত্ব দিয়েছেন। একবার হাসান ও হুসাইন (রা.) হেঁটে মসজিদে এলে তিনি মিম্বর থেকে নেমে তাঁদের কোলে তুলে নেন এবং বলেন, “আল্লাহ সত্য বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের সন্তানরা পরীক্ষা।’ আমি এ দুজনকে দেখে আর ধৈর্য ধরতে পারলাম না।” (বায়হাকি, হাদিস ৫৮১৯)। এ ঘটনাগুলো ইসলামি সমাজে শিশুদের স্থান ও মর্যাদার একটি উদাহরণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (তিরমিজি, হাদিস ১৯২১)। এটি মুসল্লিদের জন্য একটি স্পষ্ট নির্দেশনা। শিশুদের স্বাভাবিক চঞ্চলতায় বিরক্ত না হয়ে, বরং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া আবশ্যক। কারণ, মসজিদে শিশুদের উপস্থিতিই আগামী দিনের মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করবে।

বাংলাদেশের বহু মসজিদে শিশুদের নিয়ে আসার ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে। একদিকে কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে শিশুদের কান্নাকাটি বা দৌড়ঝাঁপ নামাজের খুশুতে বিঘ্ন ঘটায়। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই মসজিদে আনলে তারা আল্লাহর ঘরের সঙ্গে পরিচিত হবে এবং দ্বীনদার হিসেবে বেড়ে উঠবে। এই দুই প্রেক্ষাপটের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো শিশুদের ধীরে ধীরে শৃঙ্খলিত করা, যাতে তারা মসজিদের পরিবেশে অযথা চিৎকার বা বিশৃঙ্খলা না করে। তবে এটি সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে মুসল্লিদের উচিত সহনশীল হওয়া। কেউ যদি নামাজে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে চান, তবে মসজিদের ভেতর শিশুর উপস্থিতিকে বিরক্তিকর মনে না করে বরং তা ইসলামি সমাজের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

শিশুরা আজকের দিনে যত বেশি মসজিদমুখী হবে, আগামী দিনের সমাজে তত বেশি দ্বীনদার প্রজন্ম তৈরি হবে। নবী করিম (সা.) নিজে শিশুদের কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করে এ বার্তাই দিয়েছেন—আল্লাহর ঘর শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ নয়, বরং এটি তাদের আত্মিক প্রশিক্ষণের প্রাথমিক ক্ষেত্র।

এ কারণে ধর্মীয় শিক্ষাবিদ, সমাজ বিশ্লেষক এবং অভিভাবকরা মনে করেন, শিশুদের মসজিদে উপস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা এবং তাদের প্রতি ধৈর্যশীল হওয়া জরুরি। শিশুর কান্না, দৌড়ঝাঁপ বা চঞ্চলতাকে বিরক্তি হিসেবে দেখা ইসলামের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং শিশুদের উপস্থিতিকে মসজিদের সৌন্দর্য, কলরবকে শোভা এবং ভবিষ্যতের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।কোরআন ও হাদিসের আলোকে পরিষ্কার যে শিশুদের মসজিদে আনা শুধু অনুমোদিতই নয়, বরং প্রশংসনীয় একটি কাজ। মুসল্লিদের জন্য বার্তাটি হলো ধৈর্য ও সহনশীলতা, অভিভাবকদের জন্য বার্তাটি হলো দায়িত্ব ও শৃঙ্খলা। মসজিদ আল্লাহর ঘর, আর শিশু সেই ঘরের আগামী দিনের কণ্ঠস্বর। আজকের শিশুর উপস্থিতি আগামী দিনের মসজিদভরা সমাজের পূর্বাভাস। তাই শিশুদের কলরবকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, বরং মসজিদের প্রকৃত শোভা হিসেবে দেখা উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com