১২ লাখ টাকায় সালমান শাহ হত্যার চুক্তি’

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৯ বার
১২ লাখ টাকায় সালমান শাহ হত্যার চুক্তি’

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একজন স্মরণীয় প্রতিভার নাম সালমান শাহ। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তার অকাল মৃত্যু দেশজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে শোকের ছাপ রেখেছিল। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় রহস্যজনকভাবে তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। 당시 সংবাদমাধ্যমে এটিকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, ২৯ বছর পর বিষয়টি নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ সময়ের গোপন তথ্য, পুরোনো জবানবন্দি এবং পুনঃতদন্তের আলোকে এই মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে।

সালমান শাহর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন নানা জল্পনা ও সমালোচনা চললেও মূল রহস্য উদঘাটিত হয়নি। সম্প্রতি মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হওয়ায় আগের সমস্ত প্রশ্ন আবারো আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে রেজভী আহমেদ ফরহাদের দেওয়া একটি জবানবন্দি নতুন করে আলোচিত হয়েছে। এই জবানবন্দিতে রেজভী দাবি করেছেন, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে সাজানো হয়েছিল। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী সামিরা হক, শাশুড়ি লতিফা হক লুসি এবং আরও কয়েকজনের সরাসরি জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

হাসিনাসহ তিনজনের বিচারকাজ শেষ: রায়ের দিন ১৩ নভেম্বর

রেজভীর দাবি অনুযায়ী, সালমান শাহর হত্যা ছিল একটি চুক্তিভিত্তিক পরিকল্পনা। হত্যার পুরো প্রক্রিয়ার জন্য ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই চুক্তিটি করেছিলেন সালমান শাহর শাশুড়ি লতিফা হক লুসি। পরিকল্পনায় ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের খলনায়ক ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদ এবং আরও কয়েকজন। হত্যার প্রক্রিয়া গোপন রাখার জন্য পরিকল্পনাকারীরা শুরুতেই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন।

রেজভীর ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে গুলিস্তানের একটি বারে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদ, ছাত্তার, সাজু এবং রেজভী। ফারুক তখন দুই লাখ টাকা বের করে জানান, সামিরার মা এই অর্থ প্রদান করেছেন। পরে টাকা নিয়ে ডনের সঙ্গে ফারুকের কথাকাটাকাটির পর আরও চার লাখ টাকা যোগ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী হত্যার আগে ৬ লাখ এবং হত্যার পরে ৬ লাখ টাকা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এরপর হত্যার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যেমন প্লাস্টিকের দড়ি, ক্লোরোফর্ম, রিভলবার ও সিরিঞ্জ প্রস্তুত করা হয়।

রেজভী জানিয়েছেন, রাত আড়াইটায় সালমান শাহর ইস্কাটনের বাসায় পৌঁছান ডন, ডেভিড, ফারুক এবং আজিজ মোহাম্মদ ভাই। সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন সালমানের স্ত্রী সামিরা, শাশুড়ি লতিফা হক লুসি এবং আত্মীয়া রুবি। ঘুমন্ত অবস্থায় সালমানকে ক্লোরোফর্ম প্রয়োগ করে অচেতন করা হয়। কিছু সময় পর তার জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এক পর্যায়ে আজিজ ইনজেকশন প্রয়োগের নির্দেশ দেন। রেজভীর দাবি অনুযায়ী, এরপর ইনজেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে সালমানকে হত্যা করা হয় এবং তার লাশকে সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে আত্মহত্যা ভান করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীর তালিকায় রয়েছে নায়কের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক। এছাড়া মামলায় ১১ জনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক ডন, নায়কের শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, মেফিয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আবদুস সাত্তার, সাজু এবং রেজভী আহমেদ ফরহাদ।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা মনে করেন, সালমান শাহর অকাল মৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে একটি শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল। মাত্র কয়েকটি সিনেমায় তার অসাধারণ অভিনয় দর্শক হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে গেছে। এই হত্যার তথ্য প্রকাশ এবং জবানবন্দি মামলায় নতুন মোড় আনার ফলে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা আবারো শোকের সঙ্গে এই ঘটনার পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন।

সমাজমাধ্যম এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে এই খবর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দীর্ঘদিন ধরে গোপন তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে এবং হত্যাকাণ্ডের আসল সত্য উদঘাটনের আশা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের মতো চরম এবং পরিকল্পিত ঘটনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে বিরল। এটি শুধু একটি ব্যক্তি নয়, বরং তার সৃষ্টির প্রভাব এবং চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সালমান শাহর মৃত্যু শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, পুরো চলচ্চিত্রাঙ্গনের জন্যও শোকের বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হয়নি, তবে পুনঃতদন্ত ও নতুন জবানবন্দি এক নতুন আলোচনার পথ খুলেছে। হত্যার বিষয়টি চুক্তিভিত্তিক ও অর্থের জন্য সংগঠিত হওয়ায় এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনায়ও নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনও চলমান। তদন্ত কর্মকর্তা, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা তথ্য সংগ্রহ ও প্রমাণ যাচাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ২৯ বছরের গোপন তথ্য পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মামলার সকল আসামি এবং তাদের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্য সংগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এ ঘটনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি মর্মস্পর্শী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সালমান শাহর অসাধারণ প্রতিভা, অকাল মৃত্যু এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের মনে প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটন হলে তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ন্যায় ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে বলা যায়, সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখনো দেশের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর প্রভাব ফেলছে। নতুন জবানবন্দি, পুনঃতদন্ত ও মামলার অগ্রগতির মাধ্যমে দেশের ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়ার আশা জাগছে। তবে এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্প এবং সামাজিক ন্যায়বোধের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com