প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে এই সর্বোচ্চ সাজার ব্যাপক ও ধারাবাহিক প্রয়োগ একটি অত্যন্ত বেদনার্ত ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এক বিভৎস ও আতঙ্কজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। তাদের নথিবদ্ধ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশটিতে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই তালিকায় নিজস্ব নাগরিকের চেয়ে ভিনদেশি অভিবাসীদের সংখ্যাই বেশি, যা সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
সংস্থাটির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের প্রথম অর্ধে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৫৯টিই কার্যকর করা হয়েছে বিদেশি নাগরিকদের ওপর। অর্থাৎ, মোট কার্যকর হওয়া শাস্তির প্রায় ৫৪ শতাংশই ছিল প্রবাসী বা ভিনদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে। এর বিপরীতে সৌদি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ছিল ৪৯, যা মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৪৬ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের চরম বৈরী আইনি ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে বাংলাদেশিসহ মোট ১৭টি দেশের নাগরিক এই কঠোর সাজার মুখোমুখি হয়েছেন। এই তালিকাতে বাংলাদেশ ছাড়া আরও রয়েছে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তান। ভাগ্য অন্বেষণে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে পাড়ি জমানো মানুষগুলোর এমন করুণ পরিণতি তাদের স্বজনদের জীবনকে এক বিভীষিকাময় অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার চরম অভাব এবং ন্যায্য বিচার পাওয়ার সুযোগ না থাকার বিষয়টি সৌদির বিচারব্যবস্থাকে দীর্ঘ দিন ধরে বিতর্কিত করে রেখেছে। এই পরিসংখ্যান প্রকাশের অতি সম্প্রতি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে তথাকথিত অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড প্রথম ছয় মাসের মূল হিসাবের অন্তর্ভুক্তও ছিল না, অর্থাৎ প্রথমার্ধের হিসাবের বাইরেও নিরবচ্ছিন্নভাবে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রবাসে সঠিক আইনি সহায়তার অভাব, ভাষার সীমাবদ্ধতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার জটিলতা বুঝে ওঠার আগেই অনেক প্রবাসীকে ফাঁসির মঞ্চে বা তরবারির নিচে জীবন দিতে হচ্ছে।
চলতি বছরে যে ১০৮টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তার পেছনে থাকা অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সবচেয়ে বেশি সাজা দেওয়া হয়েছে মাদক-সংক্রান্ত মামলায়। নথিবদ্ধ তথ্য মতে, মাদক-সংংশ্লিষ্ট অপরাধের দায়ে ৭১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সাজার প্রায় ৬৫.৭ শতাংশ। অর্থাৎ সিংহভাগ মৃত্যুদণ্ডই ছিল অহিংস এবং নন-ভায়োলেন্ট অপরাধের সাথে সম্পর্কিত। এই ৭১টি মাদক অপরাধের মধ্যে ৪৯টি মৃত্যুদণ্ডই কার্যকর হয়েছে বিদেশি নাগরিকদের ওপর, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের মামলায় ২৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা মোট সাজার ২৩ শতাংশ। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান আরও স্পষ্ট করে যে, ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টিই এমন অপরাধের জন্য প্রয়োগ করা হয়েছিল, যার সাথে সরাসরি কোনো মানুষের জীবনের ক্ষতি বা হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তা সত্ত্বেও রাজকীয় বিচার ব্যবস্থার অধীনে তাদের জীবনের প্রদীপ চিরতরে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, এসব শাস্তির একটি বড় অংশ কার্যকর করা হয়েছে বিচারকদের একক বিবেচনামূলক ক্ষমতা বা তাজির শাস্তির ওপর ভিত্তি করে। সাজার প্রকৃতির দিক থেকে বিচার করলে ৮৪টি মৃত্যুদণ্ডই তাজির নীতিতে কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সাজার ৭৭.৭ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও আইনি নীতি অনুযায়ী বিচারকদের একাংশের এই একক ও অসীম বিবেচনার প্রয়োগ বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত।
মানবাধিকার সংস্থাটির অনুসন্ধানে সৌদি আরবের এই কঠিন বিচার ব্যবস্থার ভেতরে থাকা অপরিসীম গোপনীয়তা এবং তথ্যের অসচ্ছতার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টির ক্ষেত্রেই আগে থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পূর্বতথ্য কিংবা সরকারি নথি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এটি মোট মামলার ৮৪.২ শতাংশ। অর্থাৎ আসামিদের বিচারপ্রক্রিয়া, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং সাজা কার্যকরের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সবকিছুই চরম গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বা সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোও ফাঁসি বা শিরশ্ছেদের পর ঘটনা জানতে পারে, যা অমানবিক ও আন্তর্জাতিক সনদের পরিপন্থী।
সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং তাঁর পুত্র যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার পূর্বের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই দুই শাসকের আমলে চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট শাসনামলে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কঠোরতার ধারাবাহিকতায় গত জুনে সৌদ আল-ফারাজ নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যাকে জাতিসংঘ আগে থেকেই অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে বলে ঘোষণা করেছিল। একইভাবে গত এপ্রিলে আলী আল-সুবাইতি নামের এক যুবকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে মাত্র ১২ বছর বয়সে একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।
সংস্থাটির সুনির্দিষ্ট ও নথিবদ্ধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বছরের প্রথম অর্ধে কার্যকর হওয়া ১০৮টি চরম দণ্ডের মধ্যে ৫৯টিই কার্যকর করা হয়েছে প্রবাসী বিদেশি নাগরিকদের ওপর। শতাংশের হিসাবে মোট কার্যকর হওয়া সর্বোচ্চ শাস্তির প্রায় ৫৪ শতাংশই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ভিনদেশি অভিবাসীদের কাঁধে। এর বিপরীতে সৌদি আরবের নিজস্ব নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ছিল ৪৯, যা মোট দণ্ডের প্রায় ৪৬ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের চরম রক্ষণশীল, জটিল ও কঠোর বিচার ব্যবস্থার জালে আটকা পড়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ১৭টি দেশের নাগরিক এই ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছেন। এই দীর্ঘ ও মর্মান্তিক তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের মতো উন্নয়নশীল ও সংঘাতকবলিত দেশের নাগরিকেরা। বিদেশের মাটিতে কোনো প্রকার স্বচ্ছ আইনি প্রতিরক্ষা ছাড়া একজন প্রবাসীর জীবনাবসান কেবল একটি সামাজিক পরিসংখ্যান নয়, বরং তা সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পরিবারের জন্য চিরতরে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার এক বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডি।
আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদণ্ডে স্বচ্ছতার ঘোরতর অভাব এবং অভিযুক্তের পক্ষে ন্যায্য আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না থাকার বিষয়টি সৌদি আরবের বিচারিক কাঠামোকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে বিতর্কিত ও সমালোচিত করে রেখেছে। এই পরিসংখ্যান প্রকাশের অতি সম্প্রতি সৌদি আরবের পরম পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে তথাকথিত অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চরম সংবাদ সামনে এসেছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড প্রথম ছয় মাসের প্রাথমিক ১০৮ জনের হিসাবের অন্তর্ভুক্তও ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে মূল পরিসংখ্যানে যা নথিবদ্ধ হচ্ছে, তার বাইরেও নীরবে এবং আড়ালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়েই যাচ্ছে দেশটির কতৃপক্ষ। প্রবাসে সঠিক ও দক্ষ আইনি সহায়তার অনুপস্থিতি, ভাষার কঠিন বাধা এবং জটিল আদালত প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি বুঝতে না পারার কারণে অনেক নিরীহ বা স্বল্প অপরাধে অভিযুক্ত প্রবাসীও চরম দণ্ডের মুখে ঢলে পড়ছেন।
চলতি সালের প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের পেছনে থাকা অপরাধের ধরন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধগুলো। নথিবদ্ধ তথ্যানুসারে, কেবল মাদক-সংংশ্লিষ্ট মামলার দায়েই ৭১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সাজার প্রায় ৬৫.৭ শতাংশ। অর্থাৎ সিংহভাগ মৃত্যুদণ্ডই প্রদান করা হয়েছে এমন সব অপরাধে, যেগুলো হিংসাত্মক নয় বা সরাসরি রক্তপাতের সাথে জড়িত নয়। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই ৭১টি মাদক অপরাধের মধ্যে ৪৯টি মৃত্যুদণ্ডই কার্যকর করা হয়েছে বিদেশি নাগরিকদের ওপর, যা সমগ্র সাজার ৪৫.৩ শতাংশ। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকেরা। অন্যদিকে, প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের মামলায় ২৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা মোট সাজার ২৩ শতাংশ। এছাড়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য সাধারণ অপরাধমূলক মামলায় আরও ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
এই হিসাব থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ১০৮টি কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টিই ছিল এমন সব অপরাধের জন্য দেওয়া সাজা, যার সাথে সরাসরি কোনো মানুষের প্রাণহানি বা হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক ছিল না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন স্পষ্টতই কেবল অত্যন্ত গুরুতর ও সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রেই চরম সাজা নিয়ন্ত্রিত রাখার সুপারিশ করে, কিন্তু সৌদি আরব সেই নীতি তোয়াক্কা না করেই সাধারণ অপরাধেও জীবনের প্রদীপ চিরতরে নিভিয়ে দিচ্ছে। অধিকন্তু, এসব শাস্তির এক সিংহভাগ অংশ কার্যকর করা হয়েছে বিচারকদের একক বিবেচনামূলক ক্ষমতা বা তথাকথিত ‘তাজির’ নীতির ভিত্তিতে। সাজার প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ১০৮টি সাজার মধ্যে ৮৪টি মৃত্যুদণ্ডই বিচারকের একতরফা ‘তাজির’ ক্ষমতাবলে দেওয়া হয়েছে, যা মোট সংখ্যার ৭৭.৭ শতাংশ। বিচার ব্যবস্থার ভেতরে এমন অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত বিচক্ষণতার প্রয়োগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরমভাবে নিন্দিত হয়ে আসছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির অনুসন্ধানে সৌদি আরবের এই কঠিন কাঠামোর ভেতরে বিরাজমান চরম গোপনীয়তা ও তথ্যের অপরিসীম অসচ্ছতার এক ভীতিকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। সংস্থাটি নথিবদ্ধ করে জানিয়েছে, প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টির ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগ পর্যন্ত ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোনো ধরনের আগাম তথ্য, আদালতের নথি বা সাজার খবর জানতে পারেনি। এটি মোট সংগৃহীত মামলার ৮৪.২ শতাংশ। আসামিদের কীভাবে বিচার করা হচ্ছে, তাদের ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে কি না, কিংবা তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সামান্য সুযোগ পেয়েছেন কি না—তার সবকিছুই গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর মৃতদেহ পরিবারকে ফেরত দেওয়া তো দূরের কথা, পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিতও করা হয় না, যা চরম অমানবিকতার এক অনন্য নজির।
বর্তমানেও সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে হাজার হাজার বন্দি মৃত্যুদণ্ডের ভয়াবহ আতঙ্ক বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ইএসওএইচআর-এর তথ্যমতে, সেখানে এখনো রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণের কারণে এবং শৈশবে সংঘটিত কথিত অপরাধের দায়ে অনেক মানুষ ফাঁসির দড়ির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। শেখ সালমান আল-আওদা এবং শেখ হাসান আল-মালিকির মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বরা স্রেফ শান্তিপূর্ণ মতামত প্রকাশের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তদুপরি, খামিস মুশাইত, নাজরান এবং তাবুক কারাগারে বহু ইথিওপীয়, সোমালীয় ও মিসরীয় নাগরিক কনডেম সেলে চরম মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। সঠিক দোভাষী না থাকা, আইনি পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং হঠাৎ করে কাউকে তুলে নিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ফলে কারাগারগুলোতে প্রতিনিয়ত ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক নানামুখী চাপ ও জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ স্বাক্ষর সত্ত্বেও সৌদি কর্তৃপক্ষ যেভাবে মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ সাজা অব্যাহত রেখেছে, তা বৈশ্বিক বিচারিক ব্যবস্থার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত