কৃষকের ঘরে উঠছে নতুন পেঁয়াজ, আমদানি হলে ক্ষতির শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
পেঁয়াজের দাম বাড়ায় সীমিত আমদানির সিদ্ধান্ত ভাবছে সরকার

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার বাজদিয়া গ্রামের কৃষক ইমরান হোসেনের এই বছর গ্রীষ্মকালীন আগাম জাতের পেঁয়াজ চাষের পরিকল্পনা ছিল বড় স্বপ্নের মতো। তিনি ২০ কাঠা জমিতে বীজ বপন করেছিলেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তার ফসলের অর্ধেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বাকি ১০ কাঠায় তিনি আনুমানিক ২০ মণ পেঁয়াজ ফলন করেছেন। নিজের পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী দুই মণ রেখে বাকি পেঁয়াজ ইতিমধ্যেই তিনি বিক্রি করেছেন কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়।

ইমরানের মতোই চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা সহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বহু কৃষক আগাম জাতের পেঁয়াজ চাষ করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় এ উদ্যোগ দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ পেঁয়াজগুলো ব্যাপকভাবে বাজারে পৌঁছাবে। তবে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির খবরে কৃষকেরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারা মনে করছেন, যদি এ সময় বিদেশি পেঁয়াজ বাজারে আসে, তবে নিজেদের উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

জীবননগর বাজদিয়া গ্রামের কৃষক আসাদ আলী বলেন, “এবারো দেশে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হবে। আমাদের কৃষকেরা পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশ থেকে আমদানির অনুমতি দিলে আমরা দাম পাব না। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের পুঁজি হারিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ, এই মুহূর্তে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।” কৃষকরা এককথায় জানিয়েছেন, স্থানীয় উৎপাদিত পেঁয়াজের মূল্য বজায় রাখতে এখনই বিদেশি পেঁয়াজ আমদানি করলে ক্ষতি অনিবার্য।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. জামাল উদ্দীন জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে কোনো পেঁয়াজ সংকট নেই। কৃষকের হাতে প্রায় তিন লাখ টন পেঁয়াজ রয়েছে এবং বাজারেও সরবরাহ স্বাভাবিক। তিনি আরও জানান, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ৮৭ হাজার টন এবং ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে আরো আড়াই লাখ টন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। এর ফলে কোনো ধরনের খাদ্য সংকট হওয়ার কথা নয়। তবে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে আমদানির সুযোগ খুঁজছে।

ড. জামাল উদ্দীন বলেন, “আগাম জাতের পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। কৃষকের হাতে থাকা পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ার কারণে দাম ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে। দু-তিন দিনের মধ্যে আরও কমে আসবে। এ সময়ে বিদেশি পেঁয়াজ আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। যদি অনুমতি দেওয়া হয়, কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন। আমাদের কৃষকরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি রোধ করা সম্ভব।” তিনি আরও বলেন, বিগত ১৫ বছরে যারা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করত, তারা এবার সুবিধা করতে পারছে না। তাই কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দামের ওঠানামা ঘটাচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (ইমপোর্ট পারমিশন) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হাতে। বাজার পরিস্থিতি, কৃষকের স্বার্থ এবং উৎপাদন পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) বনি আমিন খান বলেন, “পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিলে কোনো আইপি দেওয়া সম্ভব নয়। এ মুহূর্তে দুই হাজার ৮০০-এর বেশি আমদানি আবেদন রয়েছে।”

সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী উভয়ই মনে করছেন, পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি আসলে মৌসুমিক এবং কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সম্প্রতি বলেছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যে দাম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না আসলে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাজারে স্থানীয় উৎপাদনের চাহিদা এখনও পূরণ হচ্ছে। তবে মৌসুমের শেষে মজুত কমে যাওয়ায় সাময়িকভাবে দাম বেড়েছে। গত দেড় সপ্তাহে কেজিতে পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, যা বর্তমানে ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা শাহীন মিয়া জানান, সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আড়ত থেকে কিনতে হচ্ছে ১০৩ থেকে ১০৭ টাকা দরে। টিসিবি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এই সময়ে পেঁয়াজের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। সেক্ষেত্রে চলতি বছরের দাম এখনও ২৫ শতাংশ কম।

আব্দুল কাদের নামের এক ব্যবসায়ী জানান, বাজারে পরিকল্পিতভাবে দাম বৃদ্ধি ঘটছে। ভারতের পেঁয়াজ কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে। তাই কম দামে আমদানি করে ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিতে চাচ্ছেন। শ্যামবাজারের এক আড়তদারের মতে, দেশি পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে দাম বৃদ্ধি করে ভারত থেকে কম দামে আমদানির সুযোগ তৈরি করছেন। প্রতিবছর বছরের শেষের দিকে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজি রয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এই সমস্যা মোকাবেলায় সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কৃষকরা নতুন পেঁয়াজের ফলন নিয়ে আশাবাদী হলেও, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং সম্ভাব্য বিদেশি আমদানির খবর তাদের আয়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করছে। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই মুহূর্তে দেশের কৃষক এবং বাজারের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নীতি গ্রহণে সচেষ্ট রয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত