প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চবিতে ভুয়া শিক্ষার্থী আটক হওয়ায় ক্যাম্পাসজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তৃত সবুজ ক্যাম্পাস সাধারণত শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের প্রাণচঞ্চল চলাচলে ভরপুর। অথচ গত এক সপ্তাহে পরপর দুই ভুয়া শিক্ষার্থী ধরা পড়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে অস্বাভাবিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সীমান্ত ভৌমিক নামে এক তরুণকে আটক করার মধ্য দিয়ে এই উদ্বেগ আরও গভীর হয়। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয়ে কখনো ক্লাসরুমের সামনে, কখনো হলের আশেপাশে, কখনো আবার বিভিন্ন আড্ডা এবং দোকানে সময় কাটাতেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগের রেজিস্ট্রেশনেই তাঁর নাম নেই।
আটক সীমান্ত ভৌমিক খুলনার বাসিন্দা। শিক্ষার্থীরা জানান, তাঁকে বিভিন্ন দিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে দেখা গেলেও কখনো সন্দেহ হয়নি যে তিনি প্রকৃত শিক্ষার্থী নন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তাঁর আচরণ এবং কিছু অভিযোগ সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে। মঙ্গলবার দুপুরে একদল শিক্ষার্থী তাঁকে ধরে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান।
প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, সীমান্ত নিজেকে মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী পরিচয় দিতেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াতেন এবং এ সময় তিনি বিভিন্নজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রক্টর অফিসে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এসব অভিযোগ আরও স্পষ্ট হয়। তিনি জানান, সীমান্তকে নিরাপত্তা দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা জানাচ্ছেন, সীমান্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ২০২৪ সাল থেকেই অবস্থান করছিলেন। দক্ষিণ ক্যাম্পাসের একটি ভাড়া বাসায় নিয়মিত থাকতেন। শিক্ষার্থীরা আরও জানান, ক্যাম্পাসের চায়ের দোকান, স্টেশনারি দোকান এবং বিভিন্ন ছাত্রী–ছাত্রের কাছ থেকে তিনি মোট সাড়ে ১৮ হাজার টাকার বেশি ধার করেছিলেন, কিন্তু কোনো দেনাই শোধ করেননি। টাকার দাবি করা হলে তিনি নানা অজুহাত এবং পরিচয়ের কথা বলতেন। কেউ তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললে তিনি বিভাগ বা ব্যাচের এমন কিছু তথ্য দিতেন, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো।
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইখলাস বিন সুলতান জানান, কিছুদিন ধরে সীমান্তকে নিয়ে সন্দেহ বাড়ছিল। তিনি বারবার পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছিলেন। পরে মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটে গিয়ে খোঁজ নেওয়া হলে জানা যায়, সেখানে এই নামে কোনো শিক্ষার্থী নেই। সন্দেহ আরও দৃঢ় হলে তাঁকে কৌশলে অতীশ দীপঙ্কর হলের পেছনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি ছাত্রত্ব না থাকার কথা স্বীকার করেন।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সীমান্ত দাবি করতেন যে তিনি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। কিন্তু বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিশ্চিত করেছেন, তাঁকে কখনো ক্লাসে বা বিভাগের কোনো কার্যক্রমে দেখা যায়নি। তবুও তিনি এমনভাবে মিশতেন যে তাঁকে ভুয়া ভাবা কঠিন ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলছে, সীমান্তের বিরুদ্ধে শুধু পরিচয় জালিয়াতি নয়, প্রতারণা এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপত্তা দপ্তরে রাখা হয়েছে। পুরো ঘটনার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে ক্যাম্পাস এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত পরিবেশে বহিরাগত প্রবেশের সুযোগ থাকলেও নিরাপত্তা জোরদার না হওয়ায় এমন ঘটনা বাড়ছে। গত ২৭ নভেম্বর মিনহাজ ইসলাম রিফাত নামে আরেকজন ভুয়া শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। তিনি নিজেকে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী পরিচয় দিতেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল এলাকায় নিয়মিত ঘোরাঘুরি করতেন। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুইজন ভুয়া শিক্ষার্থী ধরা পড়ায় অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, এর বাইরে আরও কতজন থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগেও ভুয়া পরিচয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ, প্রতারণা এবং পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় ক্যাম্পাসে এমন ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, যেহেতু বিভিন্ন বিভাগের ক্লাসের দিন–তারিখ ভিন্ন এবং ক্যাম্পাস অনেক বিস্তৃত, তাই বহিরাগতদের উপস্থিতি সহজে চোখে পড়ে না। যে কেউ একজন শিক্ষার্থীর সাথে পরিচিত হয়ে সহজেই অন্যদের চোখে প্রকৃত শিক্ষার্থীর মতো উপস্থিত থাকতে পারে।
অনেকে মনে করছেন, সীমান্তের মতো ঘটনা একদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। যদি কোনো অপরাধী বা প্রতারক দীর্ঘ দিন ক্যাম্পাসে থেকে শিক্ষার্থীদের সাথে ঘুরে বেড়াতে পারে, তাহলে তা ভবিষ্যতে আরো বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, প্রতিটি বিভাগের রেজিস্ট্রেশন আপডেট করা, ছাত্রত্ব যাচাই প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা আরোপ করা নিয়ে আলোচনা চলছে। নিরাপত্তা দপ্তরও ক্যাম্পাসে সিসিটিভি মনিটরিং বাড়ানোর কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অনেকে বলছেন, ক্যাম্পাসে যে কেউই সহজে যাতায়াত করতে পারে—এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়। কিন্তু নিয়মিত বহিরাগতদের ভিড় এবং পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করছে। তাই প্রশাসনকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারলেও সন্দেহজনক আচরণ বা দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানকারীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
এই ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তাঁরা এখন অপরিচিত কারও ছাত্রত্ব নিয়ে সন্দেহ হলে বিভাগে খোঁজ নিতে উৎসাহিত হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা অন্যদের সতর্ক করে দিচ্ছেন যাতে কেউ প্রতারণার শিকার না হন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সীমান্ত ভৌমিকের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি তাঁর থাকার জায়গা, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, এবং প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখা হবে। প্রক্টর বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সকল শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে কঠোর হচ্ছে। ভুয়া পরিচয়ধারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে পরপর দুইজন ভুয়া শিক্ষার্থী ধরা পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকে বলছেন, শিক্ষার্থীরা দূর দূরান্ত থেকে এসে ক্যাম্পাসে থাকে। যদি বহিরাগতরা বিনা বাধায় শিক্ষার্থী সাজতে পারে, তবে সেটি তাদের সন্তানদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাঁরা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ ও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রত্যাশা করছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদাই দেশের অন্যতম বৃহৎ আবাসিক প্রতিষ্ঠান। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা শুধু আইনগত সমস্যা নয়, বরং পুরো শিক্ষা পরিবেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। শিক্ষার্থীদের দাবি, কঠোর