প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাবি তিন শিক্ষক বরখাস্ত এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর একটিতে উপনীত হয়েছে। দেশের প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অভিযোগ, অনিয়ম ও বিতর্কের প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেটের এমন কঠোর অবস্থান ক্যাম্পাসজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জনমত, শিক্ষক সমাজ, শিক্ষার্থী এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারনী ফোরামের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত কেবল শাস্তিমূলকই নয়, বরং চলমান ক্যাম্পাস-পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি সাংগঠনিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন বলেও অনেকেই মনে করছেন।
৩ ডিসেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অনীক কৃষ্ণ কর্মকারকে তিন বছরের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং একইসঙ্গে আগামী ১০ বছর তাকে কোনো পরীক্ষা–সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হবে। অপরদিকে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাষ কুমার কর্মকার এবং ফাইন্যান্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সিদ্ধান্তে দুই শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল এবং একজন শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। আরও দুই শিক্ষার্থীকে এক বছরের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের পরিচয় প্রকাশ না করায় ক্যাম্পাসে ঘটনাগুলো নিয়ে আরও নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৫৪৪তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নীতিনির্ধারক সদস্যরা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ অনুমোদন করেন। যদিও বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি কোন অভিযোগ বা ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রতিটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র এসব বিষয়ে কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিশেষ করে ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহর ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়। গত ১১ মে বিকেলে তার বিভাগীয় চেম্বারে এক ছাত্রী অবস্থান করছিলেন। সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সংগঠক ও দুই সাংবাদিক সেখানে গিয়ে শিক্ষক-ছাত্রীর অবস্থানের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, শিক্ষক ও ছাত্রী আপত্তিকর অবস্থায় ছিলেন এবং ঘটনাটি তারা ক্যামেরাবন্দি করেন। অন্যদিকে শিক্ষক ও ছাত্রী পাল্টা অভিযোগ তোলেন যে তারা একাডেমিক আলোচনা করছিলেন এবং ওই কর্মীরা তাদের জিম্মি করে ভিডিও ধারণ ও অর্থ দাবি করেন। দু’পক্ষের বক্তব্য একে অপরবিরোধী হওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক আখতার হোসেন মজুমদার জানান, শিক্ষার্থীদের পরিচয় প্রকাশ না করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো একাধিক এবং এখনও কিছু অনিষ্পন্ন তদন্ত চলছে। বিশেষ করে ফাইন্যান্স বিভাগের ঘটনায় জটিলতা থাকায় এবং নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের কারণে বরখাস্ত হওয়া দুই শিক্ষকের বিষয়ে আরও বিস্তারিত সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে কিছু অনিয়ম, ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। প্রশাসনিক তদন্তে এসব ঘটনার কিছু অংশ প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্বের অপব্যবহার, নৈতিকতার প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগগুলো প্রশাসনের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়ই বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই ও ব্যক্তিগত আক্রোশের ফলেও নানা অভিযোগ তৈরি হয়। যে কারণে কিছু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মনে করেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তগুলো যদিও প্রয়োজনীয়, তবে এগুলোর নিরপেক্ষতা যাচাই করতে আরও স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া থাকা উচিত। আবার অন্য একটি মহল মনে করে, বহুদিন পর প্রশাসন যথার্থ এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু একাডেমিক পরিবেশ পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।
এদিকে শিক্ষকদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। কেউ মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর শাস্তিই সঠিক পথ, আবার কেউ বলছেন অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া অবস্থায় বরখাস্তের মতো সিদ্ধান্ত কঠোর হয়ে গেছে। শিক্ষকদের সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে দুই ভাগে বিভক্ত বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ঘটনাটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন যে ক্যাম্পাসে শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্ক সুস্থ রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, শিক্ষার্থীদের নাম প্রকাশ না করা উচিত ছিল না, যাতে সবার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার থাকে এবং সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এখনো কিছুটা উত্তেজনাকর। তদন্ত চলমান থাকায় আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। নতুন তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আরও কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে, এমনটিও জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীলরা।
এত আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যেও একটি বিষয় পরিষ্কার—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে চায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে একাডেমিক নৈতিকতা রক্ষাই এই সকল সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সামনে তদন্তের ফলাফল, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখার ওপর।
সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এবং সামনে এর প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ক্যাম্পাস রাজনীতিতে আরও গভীরভাবে প্রতিফলিত হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।