শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সম্ভাবনা: ভারতের অবস্থানে অটলতা ও আস্থার বাস্তব রাজনীতি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৩ বার
যে কারণ গুলুর জন্য হাসিনাকে ফেরত দেবে না ভারত

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থানে এখনো কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। গত এগারো মাস ধরে তিনি ভারতে অবস্থান করলেও তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নে নয়াদিল্লি অটল রয়েছে। বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক নয়, এতে রয়েছে দীর্ঘ দিনের আস্থার সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতের নিজস্ব প্রভাব ও অবস্থান সংক্রান্ত বৃহত্তর কৌশলগত ভাবনা।

বিবিসি বাংলার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেমে নেই। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে তিনি নিয়মিতই দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সর্বশেষ ৮ জুলাই তিনি আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে লাইভে অংশ নেন। যদিও সেখানে নিজেকে ঘিরে বিতর্ক বা প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য আসেনি।

এদিকে, বিবিসির সম্প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগসহ একটি কথিত গোপন অডিও প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এক ফেসবুক পোস্টে প্রতিবাদ করে এটিকে অপসাংবাদিকতার নিদর্শন বলেন। বিপরীতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এই অডিওকে সত্য বলে দাবি করে বলেন, “রাষ্ট্রীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত—এটা বিবিসির অনুসন্ধানে প্রমাণিত।”

এই অবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে গত ডিসেম্বরে কূটনৈতিক চ্যানেলে একটি নোট ভার্বাল পাঠানো হয়েছিল। ভারত তা গ্রহণ করলেও সাত মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ভারতীয় শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য মতে, শেখ হাসিনাকে তারা রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছেন একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এবং এখনো সে পরিস্থিতির মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তিত। তাদের যুক্তি, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কোনো গোপন অডিও ফাঁস হওয়া ভারতের বিবেচ্য নয়। তাছাড়া বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া কতটা সুষ্ঠু—তা নিয়েও ভারতের স্পষ্ট সন্দেহ আছে। ফলে সেখানে চার্জশিট দেওয়া হলেও ভারত সেটিকে বিচারের উপযোগী ও নিরপেক্ষ বলে মানতে রাজি নয়।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ কূটনৈতিক মহলে আলোচনা ভিন্ন। ভারতের একাধিক সাবেক কূটনীতিক মনে করছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ার প্রধান কারণ রাজনৈতিক। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে যিনি কাজ করেছেন, এমন একজন নেত্রীর বিপদের সময় পাশে না দাঁড়ানো ভারতের জন্য ভবিষ্যতের আস্থা হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়াবে—এমনটাই তাদের অভিমত। ভারতের এক সাবেক হাই কমিশনার সরাসরি বলেছেন, “এটা আস্থার প্রশ্ন। আজ যদি শেখ হাসিনার পাশে না দাঁড়ানো হয়, তাহলে আগামীতে আর কোনো নেতাই ভারতের ওপর আস্থা রাখবেন না।”

এদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে শেখ হাসিনার প্ররোচনামূলক বক্তব্যে লাগাম টানা হয়, কিন্তু ভারত সরকার সেটা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারত বলছে, শেখ হাসিনা তাদের দেশে একজন অতিথি—রাজনৈতিক বন্দি নন। ফলে তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কোনো কারণ বা প্রয়োজন নেই।

গত মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত চ্যাথাম হাউসের এক আলোচনায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানান, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা চেয়েছিলেন। তখন মোদি বলেছিলেন, ‘‘এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কারও মুখ খোলা আটকানো যায় না।’’

এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে এখনো রাজনৈতিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে রেখেছে। অডিও ফাঁস হোক বা চার্জশিট পেশ হোক—এগুলো তাদের নীতিতে কোনো প্রভাব ফেলছে না।

ভারতীয় এক সরকারি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, “আমরা শেখ হাসিনার মুখপাত্র নই। তিনি যা বলেন, তার দায়ভার আমাদের নয়। তিনি আমাদের একজন রাজনৈতিক অতিথি মাত্র, আর তার কথায় লাগাম পরানো আমাদের কাজ নয়।”

সব মিলিয়ে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায়, শেখ হাসিনাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার সম্ভাবনা এখনো প্রায় নেই বললেই চলে। এটি বিচার বা মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের আস্থার সম্পর্ক রক্ষা করার কৌশলগত বাস্তবতা। এমন বাস্তবতায় ভারত যতদিন তার নীতিগত অবস্থানে অটল থাকবে, ততদিন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ শুধু কূটনৈতিক দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে—বাস্তবে নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত