ঈদযাত্রায় সড়কে ভোগান্তি, বাড়তি ভাড়ায় ক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
  • ২১ বার

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন লাখো মানুষ। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আনন্দ ভাগাভাগি করতে কর্মব্যস্ত নগরী ছেড়ে গ্রামের পথে ছুটছেন ঘরমুখো যাত্রীরা। তবে এবারের ঈদযাত্রায় স্বস্তির পাশাপাশি ভোগান্তিও যেন সমানতালে সঙ্গী হয়েছে সাধারণ মানুষের। রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালে দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে বাস ছাড়তে দেরি এবং দালাল চক্রের সক্রিয়তা। অন্যদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল থেকেই রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসহ গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের চাপ বাড়তে শুরু করে। ভোরের দিকে যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও সকাল গড়াতেই টার্মিনালজুড়ে দেখা যায় ঘরমুখো মানুষের ঢল। পরিবার নিয়ে কেউ বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ আবার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বাস না আসায় উদ্বেগ নিয়ে বসে আছেন কাউন্টারের সামনে। শিশুদের কান্না, গরমে ক্লান্ত বৃদ্ধদের দীর্ঘশ্বাস আর ব্যাগপত্র নিয়ে ছুটোছুটি—সব মিলিয়ে রাজধানীর টার্মিনালগুলোতে তৈরি হয়েছে এক চেনা ঈদযাত্রার চিত্র।

যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চলের রুটগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। অনেক যাত্রী জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। আবার অনেকে অভিযোগ করেছেন, কাউন্টারে টিকিট না থাকলেও দালালদের কাছে অতিরিক্ত দামে সহজেই টিকিট পাওয়া যাচ্ছে।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে পাবনাগামী যাত্রী আব্দুল লতিফ মিয়া বলেন, ভোরে বাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে ট্রাকে উঠেছি। সাধারণ সময়ে যে পথ দেড় ঘণ্টায় আসা যায়, সেখানে এবার প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা লেগেছে। মহাসড়কে যানজটের কারণে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়েছে। তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে ঈদে বাড়ি যাওয়ার আনন্দ থাকলেও এই কষ্ট অনেকটা সেই আনন্দকে ম্লান করে দিচ্ছে।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান নারীযাত্রী সাথী বেগম। তিনি বলেন, টাঙ্গাইলের ঘারিন্দা এলাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে যানজট হচ্ছে। কিছুক্ষণ চলার পর আবার গাড়ি আটকে যাচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে এই যাত্রা খুবই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, ঈদের সময় সবাই বাড়ি ফিরতে চায়, কিন্তু রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকলে মানসিক চাপও বেড়ে যায়।

যাত্রী হাসান মিয়া অভিযোগ করেন, কোনো বাসেই আসন খালি নেই। অনেক বাসে দাঁড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে ট্রাকে যাত্রা করতে হয়েছে। কিন্তু সেখানে নিরাপত্তার অভাবের পাশাপাশি দুর্ভোগও বেশি। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কিছু পরিবহন মালিক ও দালাল অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনালে দালালদের তৎপরতাও চোখে পড়েছে। কাউন্টারে টিকিট না পাওয়ার সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করে টিকিট বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। অনেক যাত্রী বলছেন, টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

এদিকে উত্তরবঙ্গমুখী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে মঙ্গলবার সকাল থেকেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, রাতের বৃষ্টিপাত এবং সড়কে কয়েকটি গাড়ি বিকল হয়ে পড়ার কারণে প্রায় ২৩ কিলোমিটার এলাকায় থেমে থেমে যান চলাচল করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন অংশে ধীরগতির যান চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা।

যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানিয়েছেন, রাতের বৃষ্টি ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে সাময়িক জট তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি জানান, মহাসড়কে বিকল যানবাহন দ্রুত সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদযাত্রায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করায় সড়কপথে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট সংকটের কারণে অনেকেই বাসে যাত্রা করছেন। ফলে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। একইসঙ্গে আবহাওয়ার বৈরী পরিস্থিতিও যাত্রাপথে ভোগান্তি বাড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, যাত্রীদের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন টার্মিনাল ও মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দালাল চক্র এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে বাস্তব চিত্রে এখনো যাত্রীদের দুর্ভোগ পুরোপুরি কমেনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিকল্পনার অভাব, পর্যাপ্ত পরিবহন সংকট, সড়ক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ বাড়তি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করা তাদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করে।

তবে সব কষ্টের মাঝেও মানুষের চোখে-মুখে ছিল বাড়ি ফেরার আনন্দ। দীর্ঘ কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি শেষে প্রিয়জনের কাছে ফিরতে পারার অনুভূতি যেন সব ভোগান্তিকেও অনেকটা ভুলিয়ে দেয়। কেউ বাসের জানালার পাশে বসে গ্রামের পথের স্বপ্ন দেখছেন, কেউ আবার মোবাইলে বাড়ির খোঁজ নিচ্ছেন। কষ্টের পথ পেরিয়েও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মানুষের এই ছুটে চলা যেন বাংলাদেশের চিরচেনা সামাজিক বাস্তবতারই এক আবেগঘন প্রতিচ্ছবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত