প্রকাশ: ১৫ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জন্ম দিয়েছেন, লালন করেছেন, বড় করে তুলেছেন। সব আশাভরসা, সব কষ্টজয় শেষে শেষ বয়সে এসে সেই মা-ই যখন ছেলের গৃহে পরবাসী হয়ে পড়েন, তখন সমাজের বিবেকও স্তব্ধ হয়ে যায়। এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে নওগাঁ শহরের কাজীর মোড় এলাকায়। যেখানে ৭০ বছর বয়সী এক মা, বিলকিস আক্তার, নিজ ছেলের নির্মম আচরণে বাড়ির সিঁড়ির নিচে, গ্যারেজে বসে কাটিয়েছেন দিনের পর দিন।
ঘটনার শুরু সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে। বিলকিস আক্তার তাঁর নিজস্ব বাড়ির ফ্ল্যাটে ফিরতে গেলে দেখেন, দোতলায় ওঠার মুখে লোহার গেট, তাতে ঝুলছে তালা। বারবার চেষ্টা করে, ফোন করে ছেলেকে অনুরোধ জানান তিনি। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে আসে নির্মম প্রত্যাখ্যান—‘তুই দুই আনার মালিক, তুই গিয়ে পাথারে থাক, এই বাড়িতে তোর জায়গা হবে না।’ এরপর তিনি অসহায়ভাবে বসে থাকেন বাড়ির নিচতলার গ্যারেজে। সঙ্গে ছিল শুধু একটি চেয়ার ও পানির বোতল। বলছিলেন, “রোজা রেখেছি। সকাল থেকে কিছু খাইনি। কখনো ভাবিনি আমার সন্তান একদিন আমাকে এইভাবে তাড়িয়ে দেবে।”
এই বাড়ির ইতিহাস জানালেই বোঝা যায় এর সঙ্গে কত গভীর আবেগ জড়িয়ে আছে। বিলকিস আক্তারের স্বামী প্রায় ৩০ বছর আগে কাজীর মোড়ে ১০ শতক জমির ওপর নির্মাণ করেন এই দুইতলা বাড়ি। স্বামীর মৃত্যুর পর বাড়ির উত্তরাধিকার হন স্ত্রী বিলকিস এবং তাদের তিন সন্তান—এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেই এখন সেই সম্পত্তির দখলে থেকে মাকে বাইরে বসিয়ে রেখেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল। ছেলে মোস্তাফিজুল ইসলাম সৌরভ নিজের নামে জমি লিখে দিতে চাপ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু মা ও বোনেরা তাতে রাজি না হওয়ায় শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ২০২৩ সালে দুই মেয়েই তাদের অংশ মায়ের নামে লিখে দেন। ফলে বর্তমানে বিলকিস আক্তার বাড়ির প্রায় ৭০ শতাংশের মালিক। তবুও, তার নিজের ঘরেই তার ঠাঁই নেই।
“এই বাড়ি আমার স্বামীর স্মৃতি, এখানেই আমি থাকতে চাই। কিন্তু এখন নিজের ছেলের কাছেই আমি গৃহহীন,” — বলেন তিনি কান্নাভেজা চোখে।
বিলকিস আক্তারের বড় মেয়ের স্বামী ডা. আবুজার গাফফার বলেন, “আমার শাশুড়িকে তার ছেলে একাধিকবার গায়ে হাত তুলেছে। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি, মামলা চলছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, একজন মা যখন নিজের সন্তান দ্বারা অপমানিত হন এবং বাড়ির বাইরে বসে থাকতে হয়, সেটাই এই সমাজের বড় ব্যর্থতা।”
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ছেলে মোস্তাফিজুল ইসলাম দাবি করেন, “মা এখন আদালতের আদেশে বোনের জিম্মায় আছেন। আমাদের মধ্যে আগে মারামারি হয়েছে, মামলা হয়েছে। তিনি এখন আমার জীবনের জন্য হুমকি।”
এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা। অনেকেই বলছেন, “একজন মা শেষ বয়সে সন্তানকে আশ্রয় মনে করে ফিরেছেন নিজের ঘরে। কিন্তু তিনি ফিরে পেয়েছেন দরজায় তালা আর অন্তরে নির্মমতা।”
একজন বৃদ্ধা মায়ের এভাবে নিজের সন্তান দ্বারা উপেক্ষিত হওয়া শুধু একটি পারিবারিক সংকট নয়, এটি আমাদের সমাজের মূল্যবোধ ও মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। বিলকিস আক্তার যেন কেবল একজন মা নন, তিনি আজ হাজারো মায়ের আর্তনাদের মুখ হয়ে উঠেছেন, যারা সন্তানদের অবহেলায় নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছেন। সমাজ যদি এখনই না জাগে, তবে কাল হয়তো আরও অনেক মাকে গ্যারেজে, সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নিতে হবে, নিজেদেরই ঘরে।