পঞ্চম বছরে প্রবেশ করল ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬০ বার
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে দীর্ঘ এবং বিধ্বংসী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পূর্ণ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এই সংঘাত ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ রক্তপাত এবং মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। চার বছরের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, এবং দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড রাশিয়ার সাময়িক নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

যুদ্ধের প্রথম দিনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান মূলত ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কেন্দ্রিত ছিল। কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরোধে অভিযানটি তীব্র রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পরিণত হয়। পঞ্চম বছরে পদার্পণ করতে গিয়ে এই যুদ্ধ এখনও স্থবির হয়নি; বরং নিরবিচ্ছিন্নভাবে মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি চালিয়ে যাচ্ছে। চার বছরে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বারবার উঠলেও তা আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কম দেখানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ। ধারণা করা হচ্ছে, চার বছরের মধ্যে মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, শুধুমাত্র ২০২৫ সালে ৪ লাখ ১৮ হাজার রুশ সেনা হতাহত হয়েছে। এতে রাশিয়ার মোট সামরিক হতাহতের সংখ্যা ১২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাশিয়ার ৩ লাখ ২৫ হাজার সেনা নিহত হয়েছে।

অন্যদিকে, ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৫৫ হাজার সেনা নিহত হয়েছে। সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ৬ লাখে পৌঁছেছে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নিহত হয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার ফলে মানবিক ক্ষতি ব্যাপক।

ভূখণ্ডের দিক থেকেও যুদ্ধের চার বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া ইউক্রেনের ২৬ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করেছিল। এরপর ইউক্রেনীয় বাহিনী কিয়েভ, খারকিভ, সুমি ও চেরনিহিভ অঞ্চলে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ২০২২ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে খারকিভ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়াকে পিছু ঠেলে দেয় এবং খেরসনে দিনিপ্রো নদীর পূর্বে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রাশিয়া ১৯.৩ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখে, যা প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার।

সামরিক ব্যয়ের দিক থেকেও উভয় দেশের চিত্র বিপুল। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক ব্যয় ২০২১ সালে প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৪৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ২০২৫ সালে প্রথম ৯ মাসে ব্যয় ১৪২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। বাজেট ঘাটতি ও ঋণ কমার কারণে ব্যয় কমিয়ে ১৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালে আরও কমপক্ষে ৭ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ইউক্রেনের সামরিক ব্যয়ও ক্রমবর্ধমান। ২০২১ সালে ৬.৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে বেড়ে ৪১ বিলিয়ন, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ৬৫ বিলিয়ন এবং ২০২৫ সালে ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ৯৯ শতাংশ সহায়তা প্রত্যাহার করে। ফলে ইউরোপ ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রদান করে শূন্যস্থান পূরণ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ০.৪ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে।

রাশিয়ার ওপর আর্থিক চাপও নজিরবিহীন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে আছে, যার মধ্যে ২৩০ বিলিয়ন ডলার বেলজিয়ামে। ২০২৪ সালের মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নেয়, এই অর্থের সুদ ইউক্রেনকে দেওয়া হবে, যার ৯০ শতাংশ যাবে সামরিক খাতে, ১০ শতাংশ পুনর্গঠনে। এছাড়া ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রুশ ব্যক্তিগত সম্পদও জব্দ করা হয়েছে।

চার বছরের এই সংঘাত কেবল ভূখণ্ডের মানচিত্র পরিবর্তন করেনি, বরং মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেও বদলে দিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব থেকে উত্তরণ এবং স্থায়ী শান্তি স্থাপনের পথ এখনও দুরূহ ও অনিশ্চিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত