প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় আরও দুই পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ছাড়াও রামপুরা জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে সাবেক এসআই তরিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাবেক এএসআই চঞ্চলচন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার রায়ে আদালত ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একজন ব্যক্তি যখন নিজের জীবন রক্ষার জন্য অসহায় অবস্থায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ মামলার মূল বিষয় হিসেবে উঠে আসে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়। ওইদিন বিকেলে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় হোটেলে কাজ শেষে নিজের ফুফুর বাসায় ফিরছিলেন আমির হোসেন। বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কে পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় এবং রাস্তায় পুলিশ ও বিজিবির গাড়ি দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
প্রাণ বাঁচানোর আশায় তিনি পাশের একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনে উঠে যান। পরিস্থিতি থেকে নিজেকে আড়াল করতে গিয়ে একপর্যায়ে ভবনের ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন তিনি। তার ধারণা ছিল, এভাবে হয়তো তিনি নিরাপদে থাকতে পারবেন এবং বিপদ কেটে গেলে নিচে নামবেন।
কিন্তু সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে দেখতে পান বলে অভিযোগ উঠে। এরপর কার্নিশে ঝুলে থাকা অবস্থাতেই তার দিকে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে আমির নিচের তলায় পড়ে যান। তার চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন।
পরে তাকে বনশ্রীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিন্তু ভয়াবহ সেই ঘটনার ক্ষত শেষ পর্যন্ত আর কাটেনি।
মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে উঠে আসে, ওই ঘটনায় শুধু একজন তরুণের জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়।
রায়ের আগে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, একজন মানুষ জীবন বাঁচাতে নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে ছিলেন। এমন অবস্থায় তাকে নির্মমভাবে গুলি করা হয়েছে। তিনি জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়েছিল।
মামলার আসামিদের মধ্যে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান এবং সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া পলাতক রয়েছেন। একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি ছিলেন সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। রায় ঘোষণার দিন সকালে তাকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
আদালতের এই রায় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা ও মানবাধিকারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যদের প্রতিটি পদক্ষেপ আইন ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নয়, একই সঙ্গে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। কোনো পরিস্থিতিতেই সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়—এটাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতি।
আমির হোসেনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। একজন সাধারণ তরুণের ভয়, বাঁচার আকুতি এবং শেষ মুহূর্তের সেই অসহায় অবস্থার বর্ণনা মানুষের মধ্যে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আদালতের রায় সেই ঘটনার বিচারিক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ রায়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি বার্তা পৌঁছাবে বলে মনে করছেন অনেকে—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব, সংযম এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা অপরিহার্য। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার ও সমাজের কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার একটি প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্তকে।