প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) একটি নতুন ধরনের ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক ‘ক্যানডিডা অরিস’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা রোগীদের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ছত্রাক শুধুমাত্র নবজাতকের আইসিইউ নয়, বরং গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। এতে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণের মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
গবেষণাটি ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে পরিচালিত হয়। এতে মোট ৩৭২ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোগীদের আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সময় এবং সেখানে থাকার প্রতিটি ধাপে নিয়মিত ত্বক ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। সন্দেহজনক নমুনাগুলো ভিটেক-২ পদ্ধতিতে নিশ্চিত করা হয়।
‘ক্যানডিডা অরিস’ অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই রোগীর ত্বকে অবস্থান করতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। গুরুতর অসুস্থ, দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল রোগীদের জন্য এই ছত্রাক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া, সাধারণভাবে ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে এটি উচ্চ মাত্রায় প্রতিরোধী, যার কারণে চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, আইসিইউতে থাকা রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশের শরীরে এই ছত্রাক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ রোগী আইসিইউতে থাকার সময় সংক্রমিত হয়েছেন, যা হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণের প্রমাণ দেয়। সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার বেসরকারি হাসপাতালে তুলনায় বেশি; সরকারি হাসপাতালে প্রায় ১৩ শতাংশ রোগী সংক্রমিত হয়েছেন, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এটি মাত্র ৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে তুলনা করলে, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব রোগীর শরীরে ক্যানডিডা অরিস পাওয়া গেছে তারা তুলনামূলকভাবে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। এদের চিকিৎসায় মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, সেন্ট্রাল ক্যাথেটার ও ইউরিনারি ক্যাথেটারের মতো ইনভেসিভ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছিল, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, সব ছত্রাক ফ্লুকোনাজল প্রতিরোধী এবং প্রায় সব জীবাণুই ভরিকোনাজল প্রতিরোধী, যা প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আইসিডিডিআর, বি-এর ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, “গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে ক্যানডিডা অরিস শুধুমাত্র নবজাতকের আইসিইউতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সব ধরনের আইসিইউ-তে গুরুতর হুমকি। সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা, নজরদারি বাড়ানো এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসায় সতর্কতা জরুরি।”
কিছু নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকার আইসিইউতে পাওয়া ছত্রাক মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনভুক্ত, অর্থাৎ এটি এখন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। গবেষকরা সুপারিশ করেছেন, হাসপাতালের প্রতিটি জায়গা নিয়মিত ক্লোরিনভিত্তিক জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার রাখা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা এবং উচ্চঝুঁকি সম্পন্ন ইউনিটে নিয়মিত স্ক্রিনিং চালানো। এছাড়া অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের সংযত ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সীমিত চিকিৎসার বিকল্প দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।
গবেষকরা আরও বলেছেন, ঢাকার বাইরে এবং দেশের অন্যান্য হাসপাতালে এই সমস্যার প্রকৃত বিস্তার বোঝার জন্য বড় পরিসরের আরও গবেষণা প্রয়োজন। ক্যানডিডা অরিসের দ্রুত বিস্তার হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা পদ্ধতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।