জ্বালানি সংকট এ রাজধানীতে দীর্ঘ লাইন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৮ বার
জ্বালানি সংকট

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি, বরং ঈদ সামনে রেখে তা নতুন করে জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে সরবরাহ ঘাটতি ও দীর্ঘ লাইনের চিত্র স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এতে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে পরিবহন চালক—সকলেই চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন।

বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর খিলক্ষেত, এয়ারপোর্ট, উত্তরা, আজমপুর, মহাখালী, বিজয় সরণি ও মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক ফিলিং স্টেশন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। যেসব পাম্প খোলা রয়েছে, সেগুলোতে কয়েকশ’ মিটার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন গাড়িচালকরা। কোথাও কোথাও অকটেন সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ভুক্তভোগী চালকদের অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে এই সংকটের বাস্তব চিত্র। ভাটারা এলাকার বাসিন্দা মোটরসাইকেল চালক ফয়সাল করিম জানান, তিনি খিলক্ষেত, এয়ারপোর্ট, আজমপুর, মহাখালী ও মগবাজার ঘুরেও কোথাও অকটেন পাননি। প্রায় দুই ঘণ্টা রাস্তায় ঘুরেও জ্বালানি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই বাসায় ফিরতে হয়েছে তাকে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে খোলা তেল কেনার কথা ভাবছেন তিনি, যা পরিমাণে কম এবং দামে বেশি।

বিজয় সরণির একটি ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক চালক সৌরভ বলেন, দুপুর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, কিন্তু এখনও তার পালা আসেনি। তার ধারণা, আরও অন্তত এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান পুরান ঢাকা থেকে আসা তৌহিদুল ইসলাম তাজিম। তিনি বলেন, নিজের এলাকায় জ্বালানি না পেয়ে দূর থেকে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু অপেক্ষার সময় ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

বাড্ডা ও বসুন্ধরা এলাকা থেকেও অনেকে এসে একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, নিজ এলাকায় দিনে জ্বালানি না পাওয়ায় অন্য এলাকায় ছুটতে হচ্ছে। ফলে একটি পাম্পে একাধিক এলাকার চাপ তৈরি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই সংকটের পেছনে বিভিন্ন কারণ সামনে আসছে। অনেক ভোক্তা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অতিরঞ্জিত তথ্য পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি মজুত করতে গিয়ে পাম্পে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছেন। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং দ্রুত মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, ঈদ সামনে রেখে দূরপাল্লার বাসগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত যানবাহনের চালকরা তুলনামূলকভাবে কম জ্বালানি পাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, আগাম অর্থ পরিশোধ করার পরও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

পাম্প মালিকদের সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদ করিম কাবুল জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তিনি বলেন, সমস্যার মূল জায়গায় রয়েছে সমন্বয়ের ঘাটতি। বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় মাঠপর্যায়ে সংকট তৈরি হচ্ছে।

তবে বিপিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। তাদের মতে, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের প্রবণতার কারণেই সাময়িক এই চাপ তৈরি হয়েছে। এক কর্মকর্তা জানান, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত ডিজেল মজুত রয়েছে এবং অকটেনের একটি অংশ আমদানি হলেও সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা নেই।

সরকারি পর্যায় থেকেও সংকট নিরসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগে রেশনিং চালু করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখা এবং সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সারা দেশে সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে জেলা প্রশাসকদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। এতে মজুত যাচাই, পাম্পে সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, অবৈধ মজুত ও পাচার রোধ এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধে কঠোর নজরদারির কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এই নির্দেশনার প্রভাব এখনো তেমন দৃশ্যমান নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, সরকারি আশ্বাস ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ঈদের আগে এমন পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে এই সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত