ঈদের সেমাই: ঐতিহ্য, স্বাদ আর দামের গল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬
  • ৯ বার
ঈদের সেমাই

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঈদুল ফিতর মানেই আনন্দ, মিলন আর খাবারের আয়োজন। আর সেই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি নাম—সেমাই। শত বছর ধরে বাঙালি মুসলিম সমাজে ঈদের সকালে যে খাবারটি সবচেয়ে বেশি আবেগ, স্মৃতি আর সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে, সেটি নিঃসন্দেহে সেমাই। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে রান্নার ধরন, বেড়েছে বৈচিত্র্য, বদলেছে বাজারের চেহারা, কিন্তু সেমাইয়ের প্রতি মানুষের টান একটুও কমেনি।

নবতিপর সাকিনা খাতুনের স্মৃতিতে আজও জীবন্ত হয়ে আছে সেই পুরোনো দিনের ঈদ। বয়সের ভারে দৃষ্টি ঝাপসা, শ্রবণশক্তিও আগের মতো নেই, তবুও ঈদের সেমাইয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই তার চোখে ভেসে ওঠে অন্যরকম আলো। ছোটবেলায় মায়ের হাতে তৈরি সেমাইয়ের স্বাদ থেকে শুরু করে নিজের সংসারে রান্নার অভিজ্ঞতা—সব যেন একসঙ্গে ফিরে আসে।

তিনি জানান, একসময় বাজার থেকে শুধু তৈরি সেমাই কিনে আনা হতো না, বরং অনেক পরিবার নিজেরাই খামির তৈরি করে দোকানে নিয়ে যেত। সেখানে কলে সেমাই কেটে এনে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হতো। ঈদের সকালে সেই সেমাই ঘন দুধে রান্না করে পরিবেশন করা হতো, যা আজকের অনেক আধুনিক রেসিপিকেও হার মানায়।

ঐতিহ্যের ধারায় আরও ছিল হাতে কাটা সেমাই, যার স্থানীয় নাম ছিল ‘সেওই’। ময়দার খামির আঙুলে কেটে তৈরি করা হতো সূক্ষ্ম সেমাই, যা রান্না করলে হতো অনন্য স্বাদের। আরেক ধরনের মিহি সেমাই ‘জয়দানা’ নামেও পরিচিত ছিল, যা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হতো।

সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু ঐতিহ্যের সেই গন্ধ এখনো রয়ে গেছে দেশের নানা প্রান্তে। বিশেষ করে বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও চট্টগ্রামের সেমাই শিল্প আজও দেশের বাজারের বড় অংশ জুড়ে আছে। হাজার হাজার নারী শ্রমিক এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যাদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় ঈদের অন্যতম প্রধান উপাদান।

বর্তমানে শহরের সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার দোকান—সবখানেই সেমাইয়ের বিশাল সমাহার দেখা যায়। প্যাকেটজাত লাচ্ছা সেমাই, ঘিয়ে ভাজা প্রিমিয়াম সেমাই, খোলা লম্বা সেমাই—সব ধরনের পণ্যের উপস্থিতি চোখে পড়ে। মানভেদে কেজিপ্রতি দাম এখন ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এই দামের পার্থক্য মূলত নির্ভর করে উপকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্র্যান্ডের ওপর। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেশি, কারণ এতে ব্যবহার করা হয় উন্নতমানের উপাদান এবং প্রস্তুত প্রক্রিয়াও তুলনামূলক জটিল। অন্যদিকে খোলা বা সাধারণ সেমাই তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যায়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যেই থাকে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, ঈদকে সামনে রেখে সেমাইয়ের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। যেখানে অন্য সময় একটি দোকানে দিনে দুই-তিন প্যাকেট বিক্রি হয়, সেখানে এখন বিক্রি হচ্ছে হাজারেরও বেশি প্যাকেট। এই চাহিদা শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়, গ্রামাঞ্চলেও সমানভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সেমাই শুধু খাবার নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতীকও। ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি ঘরেই ঈদের দিনে সেমাই রান্না করা হয়। কেউ ঘন দুধে রান্না করেন, কেউ আবার লাচ্ছা সেমাই দিয়ে বিশেষ আয়োজন করেন। অনেক পরিবারে একাধিক ধরনের সেমাই রান্না করা হয়, যা অতিথি আপ্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে সেমাইয়ের বাজার কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন অতিক্রম করে। বগুড়াকে কেন্দ্র করে এই শিল্পের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতের আকার আরও বড় হয়েছে, এবং এবার তা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দামের ঊর্ধ্বগতির পেছনে রয়েছে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন খরচ। বিশেষ করে ঘি, ময়দা ও জ্বালানির দাম বাড়ায় প্রিমিয়াম সেমাইয়ের দামও বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, চাহিদা বাড়ার কারণে বিক্রিও ভালো হবে, যা তাদের এই অতিরিক্ত খরচ কিছুটা পুষিয়ে দেবে।

অন্যদিকে, ক্রেতাদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নধর্মী মনোভাব। কেউ ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা রেখে দামি সেমাই কিনছেন, আবার কেউ বাজেট অনুযায়ী সাশ্রয়ী বিকল্প বেছে নিচ্ছেন। তবে সবার লক্ষ্য একটাই—ঈদের সকালে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটি আনন্দময় মুহূর্ত উপভোগ করা।

ঈদের আনন্দ যেমন সময়ের সঙ্গে পাল্টায় না, তেমনি পাল্টায় না সেমাইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। এটি শুধু একটি খাবার নয়, বরং এটি স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক।

আজকের আধুনিক শহুরে জীবনে যখন অনেক কিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখনো ঈদের সকালে সেমাইয়ের বাটি হাতে বসে থাকা সেই পরিচিত দৃশ্যটি যেন একই রয়ে গেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার কাছে এটি এক অদ্ভুত আনন্দের উৎস।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সেমাই শুধু বাজারের একটি পণ্য নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, অসংখ্য মানুষের শ্রম এবং কোটি মানুষের আবেগ। ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দিতে এই সেমাইয়ের কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত