রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন সরকারের করণীয়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬
  • ৭ বার
রাজস্ব ঘাটতি

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ এখন এমন এক আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। গত সাত মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ঘাটতি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় চাপ তৈরি করেছে। একই সময় নতুন সরকারের প্রতিশ্রুত সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে একদিকে ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি—এই দ্বিমুখী চাপ অর্থনীতিকে একটি জটিল অবস্থানে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু করের হার বাড়িয়ে বা বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং কাঠামোগত পরিবর্তন। যেখানে করদাতাকে শুধুমাত্র অর্থের উৎস হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই ধারণার ভিত্তিতেই নতুন সরকারের জন্য একটি তিনস্তম্ভভিত্তিক কৌশল সামনে এসেছে, যা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করে তুলতে পারে।

প্রথম স্তম্ভ হিসেবে উঠে এসেছে ডিজিটাল রূপান্তর। বর্তমান বিশ্বে কর ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রযুক্তির ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতায় আয়কর, মূসক ও কাস্টমস বিভাগের মধ্যে সমন্বিত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জালিয়াতির সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ডেটাবেজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হলে করদাতাদের আয় ও সম্পদের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে করদাতাদের জন্য রিটার্ন জমা দেওয়া সহজ হবে, আবার প্রশাসনের জন্য তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

ডিজিটাল ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ই-ইনভয়েস চালু করা। এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত থাকবে এবং ভ্যাট আদায়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। এমনকি নাগরিকদের ভ্যাটের একটি অংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ দিলে তারা নিজেরাই কর ব্যবস্থার তদারকিতে অংশ নেবেন। এতে এক ধরনের সামাজিক নজরদারি তৈরি হবে, যা কর ফাঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে নগদবিহীন লেনদেনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ইউনিট গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানো গেলে করযোগ্য লেনদেনের পরিমাণ বাড়বে এবং অর্থনীতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টি সমান গুরুত্ব পেতে হবে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ব্যবস্থায় যে জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক বাধা রয়েছে, তা দূর না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়কর ও ভ্যাট বিভাগকে একীভূত করে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে এবং ব্যবসায়িক ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে করনীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা প্রতিষ্ঠানের হাতে দিলে জবাবদিহিতা বাড়বে।

বর্তমান ব্যবস্থায় একই কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয়, যা দক্ষতার অভাব সৃষ্টি করে। এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট দায়িত্বভিত্তিক টিম গঠন করা হলে কাজের গতি বাড়বে এবং তদারকি আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়করের নিরীক্ষা একসঙ্গে সম্পন্ন করা গেলে সময় ও সম্পদের অপচয় কমবে।

তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে করজাল সম্প্রসারণ এবং করভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশে ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা এক কোটি বিশ লাখের বেশি হলেও নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৪০ লাখের কিছু বেশি করদাতা। এই বিশাল ব্যবধানই রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একইভাবে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও অনেকেই নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন না।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডেটাবেজ পুনর্গঠন এবং প্রকৃত করদাতাদের শনাক্ত করা জরুরি। মৃত বা অকার্যকর নিবন্ধন বাতিল করে সক্রিয় করদাতাদের তালিকা তৈরি করলে কর ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়বে। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের তথ্য ব্যবহার করে নতুন করদাতা শনাক্ত করা গেলে করজাল আরও বিস্তৃত হবে।

কর অব্যাহতির বিষয়টিও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। অনেক ক্ষেত্রে এই সুবিধাগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না, বরং রাজস্ব ক্ষতি বাড়াচ্ছে। তাই নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে এসব সুবিধা কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে করের হার বাস্তবসম্মত রাখা হলে স্বেচ্ছায় কর প্রদানের প্রবণতা বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং করদাতাদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। করদাতারা যদি মনে করেন তাদের দেওয়া কর সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অতিরিক্ত কর দ্রুত ফেরত পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে তারা আরও আগ্রহ নিয়ে কর প্রদান করবেন। এই বিশ্বাস তৈরি করাই হতে পারে রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য করব্যবস্থা সহজ করা প্রয়োজন। কারণ এই খাত দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। তাদের জন্য সহজ হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি এবং উপযোগী করহার নির্ধারণ করা গেলে তারা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসতে উৎসাহিত হবেন।

সবশেষে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণ করতে হলে শুধু কঠোরতা নয়, প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, কাঠামোগত সংস্কার এবং করজাল সম্প্রসারণ—এই তিনটি স্তম্ভকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক করব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আর সেই ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত