বাংলাদেশ ঘিরে তিন শক্তির নতুন কূটনীতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২২ মার্চ, ২০২৬
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশকে ঘিরে বৈশ্বিক শক্তির আগ্রহ নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই আগ্রহ যেন আরও দৃশ্যমান, আরও তীব্র। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার এই উদীয়মান অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত। তিনটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব, প্রতিশ্রুতি এবং কৌশলগত আগ্রহ মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

রাজনৈতিক পালাবদলের পর ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে যেন নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই তিন শক্তি। অর্থনীতি, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং বাণিজ্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কতটা সুযোগ তৈরি করছে, আর কোথায় লুকিয়ে আছে সম্ভাব্য ঝুঁকি।

বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীনের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে তাদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। শেখ হাসিনা সরকারের শুরুর দিকে পদ্মা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে চীনের ঋণ সহায়তা উল্লেখযোগ্য ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবাহে কিছুটা স্থবিরতা আসে। শেষ পর্যায়ে এসে বেইজিং নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি প্রায় বন্ধ করে দেয়।

তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে চীন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ এবং অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। শুধু তাই নয়, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ১০টির বেশি চীনা ঋণভিত্তিক প্রকল্প চলমান রয়েছে এবং নতুন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে।

চীনের এই সক্রিয়তার পেছনে রয়েছে তাদের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার, বাণিজ্যিক রুট সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ তাদের জন্য একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু।

অন্যদিকে ভারতের অবস্থানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বহুমাত্রিক এবং ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি না থাকলেও এখন আবার বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখাচ্ছে নয়াদিল্লি।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মা সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য প্রবাহ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভারতের এই উদ্যোগকে অনেকেই দেখছেন সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে। কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এই ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই দুই আঞ্চলিক শক্তির পাশাপাশি পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। বরং ভিন্ন ধরনের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন। সরাসরি ঋণ সহায়তার পরিবর্তে তারা জোর দিচ্ছে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং জ্বালানি সহযোগিতার ওপর।

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে সেই সঙ্গে তারা অশুল্ক বাধা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাদের মতে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।

এছাড়া জ্বালানি খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ স্পষ্ট। দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিন দেশের এই সমান্তরাল তৎপরতা বাংলাদেশকে একদিকে যেমন নতুন সুযোগ এনে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার মতে, চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাময় প্রকল্প চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহায়তা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক—সবকিছুই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বরং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের “কৌশলগত সুযোগের জানালা” খুলে দিয়েছে। সঠিক নীতিনির্ধারণ এবং দক্ষ কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতাকে দেশের উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। তবে ভুল পদক্ষেপ নিলে একই পরিস্থিতি ঝুঁকির কারণও হয়ে উঠতে পারে।

অতএব, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ, চীনের অবকাঠামো সহায়তা এবং ভারতের আঞ্চলিক বাণিজ্য—এই তিনটি ধারাকে সমন্বয় করেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবমুখী এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্তই পারে এই প্রতিযোগিতাকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন অধ্যায়ে রূপ দিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত