প্রবাসী আয়ের বাড়তি প্রবাহে রিজার্ভ চাঙা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৫২ বার

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঈদ আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিবার ও পরিজনের জন্য বাড়তি খরচ মেটাতে প্রবাসীরা যে পরিমাণ অর্থ পাঠাচ্ছেন, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (গ্রোস) দাঁড়িয়েছে ৩৪.২২ বিলিয়ন ডলারে। তবে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে এই রিজার্ভ ২৯.৫২ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভের এই বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য আনন্দের খবর হলেও সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য নয়। কারণ স্বল্পমেয়াদি দায় ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে যে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভ থাকে, সেটিই মূলত দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ‘ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ’ হিসাব করে থাকে, যেখানে আইএমএফের এসডিআর, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব এবং আকুর বিলের মতো খাত বাদ দেওয়া হয়। যদিও এই তথ্য সাধারণভাবে প্রকাশ করা হয় না, তবু সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার।

গত বছরের মার্চে দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ২৫.৪৪ বিলিয়ন ডলার, বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২০.৩০ বিলিয়ন ডলার। তাই এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার, যা অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী সংরক্ষিত অর্থ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই রিজার্ভের সঙ্গে প্রতি মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় ধরা হলে দেশটি প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বিঘ্নে মেটাতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের জন্য অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকা নিরাপদ।

অতীতে দেশের রিজার্ভ কমে ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। সেই সময় বৈদেশিক ঋণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখনকার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা এবং সরকারের সময়মতো নীতিনির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত দুই কারণে। প্রথমত, ঈদ উপলক্ষে প্রবাসীরা বাড়তি অর্থ প্রেরণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, দেশীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের নতুন বিনিয়োগ না থাকায় আমদানির চাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে সামনের দিনগুলোতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এতে মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং উৎপাদনশীল সামগ্রীর আমদানি বৃদ্ধি পাবে, যা ডলারের চাহিদা আরও বাড়াতে পারে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং নতুন বিনিয়োগ থেকে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পায়, তবে দেশে ডলারের সংকট বড় আকার ধারণ করবে না। ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের যথাযথ ব্যবহার, বৈদেশিক ঋণ ও আমদানি ব্যয়ের সঠিক সমন্বয় দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেবে। বিশেষ করে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ বজায় থাকলে, রিজার্ভের স্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হবে।

এছাড়া প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে দেশের বাজারেও ধীরগতিতে লেনদেনের স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা এই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত থাকলেও, রিজার্ভ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাসী আয়ের এই ধরনের সমর্থন দেশের অর্থনীতির জন্য ভিন্ন মাত্রার স্থিতিশীলতা তৈরি করছে, যা সাময়িক বৈদেশিক চাপ মোকাবিলায় কার্যকর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, রপ্তানি উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণের সুসংগত পদক্ষেপ নেওয়া হলে দেশের মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা আরও দৃঢ় হবে। ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের যথাযথ হিসাব রাখার মাধ্যমে অর্থনীতি খাতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এভাবে প্রবাসী আয়ের সমর্থন এবং রিজার্ভের স্থিতিশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, রেমিট্যান্সের ওপর একমাত্র নির্ভরশীলতা স্থিতিশীল সমাধান নয়। দেশে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত