প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমান অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মঙ্গলবার সকালে স্পট গোল্ডের দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্ক মনোভাবেরই প্রতিফলন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আলোচনাকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী বার্তা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার প্রতি আউন্স স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৯৬ দশমিক ৭৪ মার্কিন ডলারে। এর আগে স্বর্ণের দাম গত ২৪ নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৯৭ দশমিক ৯৯ ডলারে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের বাজারে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে।
শুধু স্পট গোল্ডই নয়, ফিউচার মার্কেটেও পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। আগামী এপ্রিল মাসে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৩৪০ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে এসেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ বাজারেও স্বর্ণের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম সরাসরি ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ওএএনডিএর সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট কেলভিন ওং উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা আসায় বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিত কোনো অবস্থান নিতে পারছেন না। ফলে বাজারে এক ধরনের দ্বিধা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
স্বর্ণকে সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ার পেছনে মূলত বাজারের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য কাজ করছে। বিনিয়োগকারীরা হয়তো দ্রুত কোনো সমাধান বা আলোচনার সম্ভাবনা দেখছেন, যার ফলে নিরাপদ সম্পদে অতিরিক্ত বিনিয়োগ না করে তারা অপেক্ষার কৌশল নিচ্ছেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য বাজারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও অন্যদিকে ইরান তা অস্বীকার করছে। এই ধরনের অস্পষ্টতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে, যা স্বর্ণের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে স্বর্ণের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছে। এটি একটি বড় পতন, যা প্রমাণ করে যে বাজারে কতটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। একই সঙ্গে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও পতনের ধারা দেখা গেছে।
মঙ্গলবার স্পট সিলভারের দাম ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬৬ দশমিক ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্ল্যাটিনামের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৪১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। এছাড়া প্যালাডিয়ামের দামও ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৯৫ দশমিক ২৫ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ শুধু স্বর্ণ নয়, প্রায় সব ধরনের মূল্যবান ধাতুর বাজারেই একসঙ্গে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি এড়িয়ে স্বল্পমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করছেন। তারা এখন সরাসরি বড় বিনিয়োগ না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে বাজারে চাহিদা কিছুটা কমে যাচ্ছে, যার ফলে দামেও প্রভাব পড়ছে।
তবে এই পতন দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর। যদি সংঘাত আরও তীব্র হয় বা নতুন কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তাহলে স্বর্ণের দাম আবার বাড়তে পারে। কারণ তখন বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকবেন। অন্যদিকে যদি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রগতি হয়, তাহলে স্বর্ণের দাম আরও কমার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের জন্য স্বর্ণের দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক। বিশেষ করে স্বর্ণ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব ফেলে। ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের এই পতন স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে স্বর্ণের বাজার বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির অগ্রগতি স্বর্ণের দামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।