প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের পরিকল্পনার খবরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনপ্রণেতা। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সংঘাত নতুন মাত্রা পাবে এবং পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগন কয়েক সপ্তাহব্যাপী সীমিত স্থল অভিযানের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যা বাস্তবায়িত হলে এটি চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে একটি বড় ধরনের মোড় আনতে পারে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, পরিকল্পিত এই সামরিক পদক্ষেপ পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ বা কোনো দেশের দখল নেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। বরং বিশেষ বাহিনী এবং প্রচলিত পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনার চিন্তা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, কৌশলগত অঞ্চল কিংবা সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো এতে অগ্রাধিকার পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যদি সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিরোধী দলীয় বেশ কয়েকজন সিনেটর অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেসের পূর্ণ অনুমোদন ছাড়াই এমন বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও উদ্বেগজনক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থল অভিযান সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ কোনো অঞ্চলে সেনা পাঠানো মানে শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক সংকটের সম্ভাবনাও বাড়ে। ইরানের মতো একটি বৃহৎ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশে স্থল অভিযান শুরু হলে তা দ্রুত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রোববার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস ত্রিপোলি নেতৃত্বাধীন একটি ইউনিটের অংশ হিসেবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে স্থল অভিযান অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি, তবুও সেনা মোতায়েনের ঘটনাকে অনেকেই সম্ভাব্য উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সামরিক প্রস্তুতি অনেক সময় কূটনৈতিক চাপ তৈরির অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রতিপক্ষকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার একটি কৌশল হিসেবেও এটি দেখা যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে এতে ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঝুঁকিও থাকে।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে। দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল অভিযান শুরু করে তবে তা কঠোর প্রতিরোধের মুখে পড়বে। ইরানের আইনসভা স্পিকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের সামরিক বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
গত এক মাসে সংঘাতে বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শতাধিক সেনা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামরিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
এদিকে পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসে পরিস্থিতি শান্ত করার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা করছেন বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সতর্ক দৃষ্টি রাখছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভাব্য স্থল অভিযান শুধু সামরিক সংঘাত নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংঘাতের পরিণতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোই হতে পারে বর্তমান সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।