প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলার আঘাতের ঘটনার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় দুই শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা তেলের দামে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জ্বালানি বাজারের লেনদেন শেষে দেখা যায়, বিশ্ববাজারের প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৫২ ডলার বা প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ২৬ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৫৮ ডলার বা প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭১ দশমিক ৯২ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে চলাচলরত একটি পণ্যবাহী জাহাজে অজ্ঞাত উৎস থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলার আঘাতের পর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করে। যদিও হামলার প্রকৃত উৎস, দায়ী পক্ষ কিংবা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি, তবে ঘটনাটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেলের দামের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দ্রুত বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখান। ফলে তেলের দাম অল্প সময়ের মধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি অতিক্রম করে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এর আগের দিন অবশ্য বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। সে সময় ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—উভয় সূচকই কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসে। বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েনি। সেই আশাবাদের কারণে তেলের দাম নিম্নমুখী হয়েছিল।
তবে ওমান উপকূলে সর্বশেষ হামলার ঘটনার পর সেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বিনিয়োগকারীরা আবারও সম্ভাব্য সরবরাহ ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরু করেন। এর ফলে তেলের ফিউচার বাজারে ক্রয়চাপ বাড়ে এবং মূল্যও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দামের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যিক রুটগুলোর নিরাপত্তার ওপর। যদি এ ধরনের হামলার ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটে বা সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে উত্তেজনা কমে এলে বাজার আবারও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনের খরচ, খাদ্যপণ্যের মূল্য এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কারণ তাদের বড় অংশের জ্বালানি চাহিদা আমদানিনির্ভর।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত, কর কাঠামো ও সরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তবুও দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ওমান উপকূলে জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখন বিনিয়োগকারী, জ্বালানি কোম্পানি এবং বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের নজর থাকবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতির ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে তেলের দামের গতিপথ।