প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। রোববার (২৯ মার্চ) ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াউন্দেতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের (এমসি১৪) পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের উদ্দেশ্যে আয়োজিত বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য ও বিনিয়োগমন্ত্রী টড ম্যাকক্লে এই প্রস্তাবটি দেন। বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান এবং উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নবনির্বাচিত সরকারের লক্ষ্য ও নীতি তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের ভ্যালু চেইনে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে চায়। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বিশেষভাবে আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য জোট আরসিইপি-তে (RCEP) বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করছে। এই প্রসঙ্গে তিনি নিউজিল্যান্ডের সমর্থন কামনা করেন, যাতে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক চক্রে সমানভাবে অংশ নিতে পারে।
নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য ও বিনিয়োগমন্ত্রী টড ম্যাকক্লে বৈঠকে বলেন, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পোন্নয়নে নিউজিল্যান্ড সমর্থন দিতে প্রস্তুত এবং এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য জোরদার করা সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের সহযোগিতা আগামী বছরগুলোতে দু’দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, পণ্য ও প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা এবং বাণিজ্যিক সুবিধার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশের শিল্প ও কৃষি খাতের পণ্য রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এছাড়াও নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ডের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কেবলমাত্র পণ্য বাণিজ্য বৃদ্ধিতে নয়, বরং দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ শ্রমশক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা আরও জানাচ্ছেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও শিল্প খাতের সম্প্রসারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, নবনির্বাচিত সরকারের জন্য এটি একটি সোনালী সুযোগ, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণকে গতিশীল করবে। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যময় করতে সহায়তা করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের পাশাপাশি আয়োজিত এই বৈঠক কেবল উভয় দেশের সম্পর্ক জোরদারের একটি প্রতীক নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। এটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক মহলে বাংলাদেশের একটি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী মাসগুলোতে উভয় দেশের মধ্যে একটি কাঠামোগত আলোচনা শুরু হবে, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করা হবে। উভয় দেশই আশা করছে, এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ বাংলাদেশ এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দৃঢ় করবে না, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি নতুন দিক উন্মোচন করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের চুক্তি বাংলাদেশের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ডের মধ্যে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রস্তাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এটি শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারে।