প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে চলমান রূপান্তরমূলক উদ্যোগ ‘হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, প্রকল্পটির বর্তমান অগ্রগতি “মাঝারি মানের সন্তোষজনক”, যা এক সময়ের চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিস্থিতি কাটিয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতির প্রতিফলন।
বুধবার (১ এপ্রিল) বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ-এর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল প্রকল্পের সর্বশেষ বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তুলে ধরে। এ সময় তারা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রকল্পটি নানা কারণে ‘সমস্যাগ্রস্ত’ হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে গৃহীত কার্যকর পদক্ষেপের ফলে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এডুকেশন স্পেশালিস্ট ও টাস্ক টিম লিডার টি এম আসাদুজ্জামান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় যে পরিবর্তন ও তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে, তা প্রকল্পটিকে নতুন গতি দিয়েছে। তার ভাষায়, “এক সময় এই প্রকল্পকে ‘রিয়েল প্রবলেম প্রজেক্ট’ হিসেবে দেখা হলেও এখন তা থেকে উত্তরণের সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের ইমপ্লিমেন্টেশন স্ট্যাটাস অ্যান্ড রেজাল্টস রিপোর্ট অনুযায়ী প্রকল্পটির অগ্রগতি ‘মডারেটলি সেটিসফেক্টরি’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। একই সঙ্গে তিনি এটিকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে বিশ্বব্যাংকের একটি ‘ফ্রন্টলাইন ইনভেস্টমেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রতিনিধিদল জানায়, আগামী দুই বছরে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা, নবীন শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ক্যাম্পাস সুবিধা সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, হিট প্রকল্প বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দক্ষ এবং কর্মমুখী করে তোলা যাবে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের আওতায় নবীন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইতোমধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। এই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
ড. মামুন আহমেদ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে এবং অগ্রগতির তথ্য দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এতে করে প্রকল্পের প্রতি সংশ্লিষ্ট সকলের আস্থা বাড়বে এবং কাজের গতি আরও বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা জানান, খুব শিগগিরই প্রকল্পটির ‘মিড-টার্ম রিভিউ’ শুরু হবে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
উল্লেখ্য, পাঁচ বছর মেয়াদি এই হিট প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৫০ দশমিক ৯৬ শতাংশ অর্থায়ন করছে এবং বাকি ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। এই যৌথ উদ্যোগ দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই বাস্তবতায় হিট প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন কর্মসূচি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতায় গড়ে তোলার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ আরও জোরদার হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, এক সময়ের চ্যালেঞ্জপূর্ণ হিট প্রকল্প এখন ধীরে ধীরে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ইতিবাচক মূল্যায়ন সেই অগ্রযাত্রারই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।