প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্চ মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এই সময়ে ভারতের মোট তেল আমদানি প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ভারতের সামগ্রিক তেল আমদানির পরিমাণ কমেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে ভারতের তেল আমদানিতে। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দেশের এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি, এলএনজি সরবরাহও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য বিকল্প তেল উৎস খুঁজে বের করার চাপ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারত সস্তায় রাশিয়ার তেল আমদানি করেছিল। এ ধরনের উদ্যোগ ভারতের জন্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। রাশিয়ার তেল আমদানির কারণে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্কের মুখোমুখি করতে বাধ্য হয়। এক পর্যায়ে ভারতের পণ্য আমদানিতে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হয়।
পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শিথিল হওয়ার পর ভারত রাশিয়ার তেল আমদানিতে কিছুটা হ্রাস আনে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পুনরায় স্বীকৃতি দেয়। এই ছাড়ের ফলে ভারত সমুদ্রপথে ভাসমান নিষিদ্ধ ট্যাংকার থেকেও তেল কিনতে সক্ষম হয়েছে।
এছাড়া, আফ্রিকার কিছু দেশ যেমন অ্যাঙ্গোলা, গ্যাবন, ঘানা ও কঙ্গো থেকেও ভারতের তেল আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এই দেশগুলোর অবদান মোট আমদানিতে এখনও সীমিত। তেল বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্য এশিয়ার পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল সরবরাহ ঘুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে সমুদ্রপথে বিঘ্ন থাকলেও ভারত কিছুটা তেল সংগ্রহ করতে পারছে।
বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, এপ্রিল মাসেও রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকেও তেল আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভারতের তেল সরবরাহের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাতার থেকে ভারতের এলএনজি সরবরাহ মার্চে ৯২ শতাংশ কমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ওমান, অ্যাঙ্গোলা ও নাইজেরিয়া থেকে অতিরিক্ত আমদানি কিছুটা ঘাটতি পূরণ করেছে।
ভারত মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের ৯০ শতাংশ জ্বালানি আমদানিকৃত। ফলে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও সরবরাহে বাধা ভারতের বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দিয়েছে। জ্বালানিবিশেষজ্ঞ নরেন্দ্র তানেজা জানান, ভারতের মাটির নিচে কৌশলগত মজুত আছে, যা প্রায় ২৫ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ডিপো, শোধনাগার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মজুত মিলিয়ে মোটামুটি ৫০ দিনের তেল রয়েছে, যদিও বাস্তবে প্রায় ৪০ দিনের চাহিদা পূরণের মতো তেল ব্যবহারযোগ্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতকে নতুন উৎস থেকে তেল আমদানি বাড়াতে হবে। রাশিয়ার তেলের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতকে সতর্কতার সঙ্গে বিদেশি সরবরাহ চ্যানেল ও কৌশলগত মজুত ব্যবস্থাপনা চালাতে হবে। এ পরিস্থিতিতে তেলের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা ভারতের জন্য এক প্রয়োজনীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির পুনরায় বৃদ্ধি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। তেলের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে দেশটি এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি আমদানি ও কৌশলগত মজুতের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আগামী মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ভারতের তেল আমদানি কৌশল আরও পরিবর্তিত হতে পারে।