প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আবারও চাপ বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পণ্য আমদানি বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়ায় বাণিজ্যঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের ইঙ্গিত, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি আয় ছিল ৩০ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি কমে যাওয়াকে সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগস্ট মাস থেকে এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে আমদানিতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পণ্য আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ছিল ৪৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আমদানি বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি আরও প্রসারিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এই চাপের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো প্রবাসী আয়ের বৃদ্ধি। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রায় ২১ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা ভারসাম্য এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স না বাড়লে সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত।
চলতি হিসাবের ঘাটতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমে এসেছে। আট মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। সাধারণভাবে এই হিসাব দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেনের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে, যেখানে আমদানি-রপ্তানি ছাড়াও বিভিন্ন আয়-ব্যয়ের হিসাব অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অন্যদিকে আর্থিক হিসাব বা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এই হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪০৮ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৪৩ কোটি ডলার। এই উন্নতির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে ট্রেড ক্রেডিট বা বাণিজ্য ঋণ ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ট্রেড ক্রেডিটের পরিমাণ বেড়ে ২৫৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যায়, ট্রেড ক্রেডিট বাড়ার অর্থ হলো আগের রপ্তানির বকেয়া অর্থ দেশে আসছে। এটি সাময়িকভাবে বৈদেশিক লেনদেনে ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য নগদ প্রবাহ নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি থেকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি আয় হ্রাস এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করছে। এর ফলে ডলার বাজারে অস্থিরতা, রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদনের জন্য আমদানি নির্ভরতা বেশি হওয়ায় এ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে জ্বালানি, কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস তৈরি করা জরুরি।
অন্যদিকে নীতি নির্ধারকদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা না ফিরলে দীর্ঘমেয়াদে চাপ অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চিত্রে একদিকে যেমন রপ্তানি খাতে দুর্বলতা এবং আমদানি চাপ স্পষ্ট, অন্যদিকে কিছু সূচকে আংশিক স্থিতিশীলতাও দেখা যাচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্যঘাটতি বৃদ্ধির প্রবণতা অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।