বৈশাখ ঘিরে শীতলপাটি বুননে স্বপ্ন বোনেন কারিগররা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার
শীতলপাটি বুননে বছরের স্বপ্ন আঁকে তারা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্পে আবারও ফিরেছে ব্যস্ততা, আশা আর স্বপ্নের ছোঁয়া। বছরের অধিকাংশ সময় শান্তভাবে চললেও বৈশাখ এলে এই শিল্পে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। মেলার মৌসুমকে ঘিরে দিনরাত এক করে কাজ করছেন জেলার শত শত কারিগর, যাদের হাতের নিপুণ বুননে তৈরি হচ্ছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী পণ্য শীতলপাটি।

ঝালকাঠির রাজাপুর, নলছিটি ও সদর উপজেলার অন্তত তিন শতাধিক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শীতলপাটি তৈরির এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদের কাছে এটি শুধু পেশা নয়, বরং জীবন ও সংস্কৃতির অংশ। বৈশাখ এলেই এই পরিবারের ঘরে ঘরে শুরু হয় বুননের উৎসব, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই মিলে অংশ নেন।

স্থানীয়রা জানান, ঝালকাঠির পরিচিতি পেয়ারা আর শীতলপাটির জন্য হলেও এই পাটিই জেলার অর্থনীতির একটি বড় অংশ। সারা বছর সীমিত পরিসরে কাজ চললেও বৈশাখ ও বড় মেলার সময়েই মূলত এই শিল্পের চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণ। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জব্বারের বলী খেলা, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন বৈশাখী মেলা এবং অন্যান্য উৎসবকে ঘিরে অর্ডার আসতে থাকে ব্যাপকভাবে।

কারিগররা জানান, শীতলপাটি তৈরির কাজ মোটেও সহজ নয়। এর মূল উপাদান মুর্তা বা পাইতরা গাছ, যা পরিপক্ব হতে সময় নেয় প্রায় এক বছর। পরে এই গাছ থেকে ৮০টি বেতি বা ডগা এক পোন হিসেবে বাজারে বিক্রি হয়, যার দাম পড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মতো। একটি পাইতরা থেকে সাধারণত ১২ থেকে ২০টি বেতি তৈরি করা সম্ভব হয়। এরপর এগুলো ভাতের মাড় ও পানির মিশ্রণে কয়েকদিন ভিজিয়ে রেখে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়।

রঙিন ও সাদামাটা বেতি আলাদা করে বুননের কাজ শুরু হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ধৈর্যের কাজ। একটি শীতলপাটি তৈরি করতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ দিন। কারিগরদের মতে, এটি শুধু একটি পণ্য নয়, বরং প্রতিটি পাটির মধ্যে তাদের শ্রম, ভালোবাসা এবং ঐতিহ্যের ছাপ থাকে।

ঝালকাঠির হাইলাকাঠি গ্রামের পাটি শিল্পী আঁখি রানী বলেন, বৈশাখের সময়ের আয় দিয়েই অনেক পরিবারের সারা বছরের সংসার চলে। সারা বছর কাজ থাকলেও মূল উপার্জন আসে এই সময়েই। তাই বৈশাখের মেলা ভালো হলে তাদের জীবনও কিছুটা স্বস্তিতে কাটে।

অন্যদিকে কারিগর কৃষ্ণ চন্দ্র দাস জানান, একটি পাটি সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়, আবার কিছু পাটি এক হাজার টাকার মধ্যেও চলে যায়। কিন্তু উৎপাদন খরচ ও পরিশ্রমের তুলনায় এই দাম খুবই কম। তিনি অভিযোগ করেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না, ফলে বাধ্য হয়েই কম দামে বিক্রি করতে হয়।

তিনি আরও জানান, এই শিল্পে এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নেই। অনেক কারিগর দাদনের ওপর নির্ভর করে কাজ করেন, যার কারণে তারা আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে থাকেন। সহজ শর্তে ঋণ ও সরাসরি বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে এই শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমানে ঝালকাঠির শীতলপাটি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে। পাইকাররা জানান, বিশেষ করে জব্বারের বলী খেলার মেলার জন্য বড় অর্ডার নেওয়া হচ্ছে, যেখানে কোটি টাকার কাছাকাছি পণ্যের প্রস্তুতি চলছে।

ঝালকাঠি শীতলপাটি শিল্প যুব ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বাবুল দত্ত বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার চাহিদা অনেক বেশি। তবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সরকারি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরী। তিনি বলেন, শীতলপাটি কারিগরদের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বৈশাখকে ঘিরে এই শিল্পে তাই শুধু বাণিজ্যিক সম্ভাবনাই নয়, লুকিয়ে আছে এক ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই। কারিগরদের হাতের বুননে যেমন তৈরি হচ্ছে শীতলপাটি, তেমনি তারা বুনে চলেছেন বছরের স্বপ্ন ও জীবনের আশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত