বরিশালের বাজারে হঠাৎ ইলিশ সংকট, দামে আগুন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার
বরিশালের বাজার থেকে হঠাৎ করেই যেন উধাও ইলিশ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বরিশালের বাজারে হঠাৎ করেই ইলিশ মাছের সরবরাহে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। যে ইলিশ একসময় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় সহজলভ্য ছিল, সেটিই এখন সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ আশপাশের বাজারগুলোতে ইলিশের সরবরাহ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে হতাশ ক্রেতা ও উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা একে অন্যকে দায়ী করলেও প্রকৃত সংকটের কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র ব্যাখ্যা।

স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা যায়, যেখানে গত সপ্তাহেও প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ মণ ইলিশ বিক্রি হতো, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ মণে। পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তগুলোতে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যের পরিবর্তে এখন নীরবতা। মাছের ক্রেট নিয়ে যেসব শ্রমিক ও আড়তদার ব্যস্ত থাকতেন, তারা এখন ক্রেতার অপেক্ষায় অলস সময় পার করছেন। ক্রেতারা বাজারে এলেও দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন অনেকেই।

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশের আকারভেদে দাম এখন আকাশছোঁয়া। ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০০ থেকে ১১০০ টাকায়। ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম ইলিশ ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা, ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ১৭৫০ থেকে ১৮০০ টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ইলিশ ২৩০০ থেকে ২৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ছাড়িয়ে গেছে ৫০০০ টাকার ঘর, আর বড় আকারের এক কেজি ২০০ গ্রাম ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৬০০০ টাকারও বেশি দামে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, সামনে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট করে দাম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলে দাবি অনেকের। তবে মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি কৃত্রিম কোনো সংকট নয়, বরং সরবরাহ কমে যাওয়াই মূল কারণ।

মাছ ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের মতে, মেঘনা ও আশপাশের অভয়াশ্রম এলাকায় মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। এর সঙ্গে নববর্ষকে কেন্দ্র করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম আরও বেড়ে গেছে। আড়তদারদের ভাষায়, গত কয়েক দিনে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

একজন ক্রেতা আকরাম হোসেন বলেন, গত সপ্তাহে যে ইলিশ ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেই মাছই কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই দামে ইলিশ কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশও অনেকের জন্য এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

শহরের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা রেহেনা সিদ্দিক জানান, বাজারে ইলিশের দাম এতটাই বেড়েছে যে, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই মাছ কেনা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, প্রতি বছর বৈশাখে ইলিশের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু এবার দাম যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে উৎসবের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

মৎস্য আড়তদার জহির সিকদার বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় এবং অভয়াশ্রম এলাকায় মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমেছে। এর সঙ্গে মৌসুমভিত্তিক চাহিদা যুক্ত হয়ে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে, মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, বরিশাল অঞ্চলের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আড়তগুলোতে কার্যক্রমও কমে গেছে। যেখানে আগে প্রতিদিন শতাধিক মণ মাছ আসত, এখন তা অনেক কমে গেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে অভয়াশ্রম এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় সরবরাহ কমে গেছে। এই কারণে বাজারে ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়ে গেছে। তবে তারা আশা করছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের এই বাজার পরিস্থিতি শুধু সরবরাহের ঘাটতির কারণে নয়, বরং চাহিদা ও ব্যবস্থাপনার ভারসাম্যহীনতার ফল। উৎসব মৌসুমে যদি পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ও বাজার মনিটরিং না থাকে, তাহলে এমন পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।

বরিশালের ইলিশ বাজারের এই অস্থিরতা এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক মাছ বাজারের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া ইলিশ এখন একদিকে যেমন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কঠিন চিত্রও তুলে ধরছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত