প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দামে পরিবর্তন এসেছে, যা ভোক্তা থেকে শুরু করে জুয়েলারি ব্যবসায়ী—সবার মধ্যেই নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা–সরবরাহ পরিস্থিতির প্রভাবে এই পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন নির্ধারিত দামে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৭ টাকায়, যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম কমে যাওয়ায় সার্বিক মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দেশের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
নতুন মূল্য অনুযায়ী শুধু ২২ ক্যারেটই নয়, অন্যান্য ক্যারেটের স্বর্ণের দামও সমন্বয় করা হয়েছে। ২১ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭২০ টাকা, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২ হাজার ৮৪৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের ভরি ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮৬ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজুস জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এই দামই সারাদেশে কার্যকর থাকবে।
স্বর্ণের বাজারে এমন পরিবর্তনকে অনেকেই স্বাভাবিক সমন্বয় হিসেবে দেখলেও ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুম ও উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটার সময় এমন দামের ওঠানামা সাধারণ মানুষের বাজেটে চাপ সৃষ্টি করে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন জুয়েলারি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দাম কমার খবরে ক্রেতাদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও অনেকেই এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণ শুধু একটি বিলাসী ধাতু নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ মাধ্যমও। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে এর প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি স্বর্ণের দামে বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও ওঠানামার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাজুস আরও জানিয়েছে, স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট বাধ্যতামূলকভাবে ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে এবং তা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এই নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে।
অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বর্ণের দাম কমলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল নাও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা থাকায় আগামী মাসগুলোতে আবারও দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওঠানামা এই খাতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণ ক্রেতারা মনে করছেন, স্বর্ণের দাম স্থিতিশীল থাকলে বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তন সাধারণ মানুষের পরিকল্পনাকে ব্যাহত করছে। অনেকেই বলছেন, স্বর্ণ কেনা এখন আগের মতো সহজ সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি এখন একটি হিসাব-নিকাশের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী করা দরকার। পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
সব মিলিয়ে স্বর্ণের নতুন মূল্য দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন। স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি এলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজার পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। আপাতত ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়েই অপেক্ষায় রয়েছেন পরবর্তী বাজার পরিস্থিতির দিকে।